ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে ওয়াশিংটন কি অনুতপ্ত?

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যথাক্রমে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘রোরিং লায়ন’ নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাবকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ অব্যাহত রাখা, ইরানের নৌবাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং এই অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত করা।
যুদ্ধের সূচনা হয় যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে, যেখানে রাজধানী তেহরান ও মিনাব শহরে বিস্ফোরণ ঘটে। এসব হামলায় শাজারেহ তাইয়্যেবেহ (দ্য গুড ট্রি) স্কুলে সমবেত বহু কিশোরী নিহত হয়। দ্রুতই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর পরপরই ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং মার্কিন সামরিক কার্যক্রম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থানে—যেমন কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক ও তুরস্ক।
যুদ্ধের ২০তম দিনে এসে ইরানে প্রায় ১,৪৪৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৮,৫৫১ জনের বেশি আহত হন, যাদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। ইউনিসেফ এই পরিস্থিতিকে “বিপর্যয়কর” বলে বর্ণনা করেছে।
অল্প সময়েই এই যুদ্ধ পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে, অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধ ও ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের পর এত গভীর সংকট আর দেখা যায়নি।
গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে, যা সামরিক ঘাঁটি, তেল-গ্যাস অবকাঠামো, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও ট্যাংকারগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়। ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর বীমা খরচ বেড়ে যায়।
এদিকে আয়াতুল্লাহ খামেনির পুত্র মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। এর ফলে তেল-গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হয়, শিপিং লেন অচল হয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। ২০২৬ সালের ১৫ মার্চের মধ্যে প্রতিদিন জাহাজ আগমনের সংখ্যা সর্বনিম্নে নেমে আসে।
পরিণতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো অন্তত ১০ মিলিয়ন ব্যারেল/প্রতিদিন তেল উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ২৭ ফেব্রুয়ারির ব্যারেল প্রতি ৭৩ ডলার থেকে ১৬ মার্চে বেড়ে ১০৫.৭০ ডলারে পৌঁছায়, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় ৪০% বেশি।
বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ প্রায় ২০% কমে যায়, যা ২০২৬ সালের শেষে বাজার ব্যবস্থাকে বড়ভাবে বদলে দিতে পারে।
সংকট তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জরুরি মজুত তেল বাজারে ছাড়ে। তারা সতর্ক করে যে এই যুদ্ধ বৈশ্বিক তেল বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
যদিও প্রাথমিক হামলায় ইরানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সামগ্রিক কৌশল ব্যর্থ হতে শুরু করে। যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে।
প্রথম ছয় দিনেই মার্কিন সামরিক ব্যয় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায় (প্রতিদিন প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার)। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি দুর্বল হয় এবং জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যায়।
সমুদ্রপথে সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বাজার স্থিতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত তেল মজুত থেকে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়তে হয়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বড় চ্যালেঞ্জে পড়ে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে বিনিয়োগকারীরা ইউরোর দিকে ঝুঁকে পড়ে। ভবিষ্যতে যদি চীনা ইউয়ানে তেল লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে ডলারের আধিপত্য আরও দুর্বল হতে পারে।
ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগের সাফল্য অনিশ্চিত থেকে যায়। স্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
প্রথমত, “অস্তিত্বগত হুমকি” মোকাবেলায় ৪–৬ সপ্তাহের সীমিত যুদ্ধের পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেয়নি, যা তাদের অর্থনীতিকে আঘাত করে।
দ্বিতীয়ত, সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে উঠবে, এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। বরং তারা জাতি বহিরাগত হামলা মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ হয়।
তৃতীয়ত, নীতি ও স্বার্থের পার্থক্যের কারণে পশ্চিমা ও আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতবিরোধ বাড়ে। চতুর্থত, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ সিদ্ধান্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়—নাগরিক, প্রশাসনের সমর্থক, এমনকি সামরিক বাহিনীর ভেতর থেকেও।
আইনপ্রণেতারা হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর কার্যকর পরিকল্পনার অভাব তুলে ধরেন।
এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫৪% মানুষ ট্রাম্পের ইরান নীতি সমর্থন করেন না। ফলে বহুল আলোচিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি আবার বিতর্কে উঠে এসেছে, যা আসন্ন নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ পর্যন্ত যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে এবং তাদের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দ্রুত সমাধান না হলে, তেলের দাম বছরজুড়ে ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলারে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ১৯৭০–এর দশকের মতো স্থবিরতা ও স্ট্যাগফ্লেশন বা মুদ্রাস্ফীতির মুখে পড়তে পারে, এমনকি মন্দাও দেখা দিতে পারে।
যুদ্ধের স্থায়িত্ব উপসাগরীয় বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের স্বাভাবিকতা নির্ধারণ করবে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্রুত কৌশলগত সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও কূটনৈতিক আলোচনা এখন অত্যাবশ্যক। -মাইরা সাফদার, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি (নাস্ট)-এর নাস্ট ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজ (নিপস)-এ সহকারী ব্যবস্থাপক (গবেষণা) হিসেবে কর্মরত।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button