অপরাধী অভিজাতরা এপস্টিন ফাইলের সত্য চাপা দিচ্ছে

ক্রমশ আরও সংযুক্ত হয়ে ওঠা বিশ্বে যোগাযোগের অন্তহীন চাপ সামলাতে যদি আপনার কষ্ট হয়, তবে প্রয়াত ধারাবাহিক শিশুকামী জেফ্রি এপস্টিনের কথা একবার ভাবুন। সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ যে ত্রিশ লক্ষ নথি প্রকাশ করেছে, তা নিশ্চিত করে যে, এপস্টিন তার গড়ে তোলা বিশাল ক্ষমতাবান পরিচিতির নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় অস্বাভাবিক পরিমাণ সময় ব্যয় করতেন। শুধু ই-মেইল করাই যেন তার জন্য প্রায় পূর্ণকালীন কাজ ছিল এবং এক অর্থে তা ছিলও।
বিলিয়নিয়ার, রাজপরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রনায়ক, সেলিব্রিটি, একাডেমিক ও মিডিয়া অভিজাতদের প্রতি তিনি যে ব্যক্তিগত মনোযোগ দিতেন, সেটাই ছিল তাকে এই বিশাল ক্ষমতার নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে রাখার উপায়।
তার ঠিকানার তালিকার খাতা ছিল এমন লোকদের তালিকাসম্বলিত , যারা আমাদের ধারণা গড়ে দেয় পৃথিবী কীভাবে চালানো উচিত। কিন্তু এটাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ যে, কীভাবে তিনি এই একই ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের কিছু লোকেকে আরও গভীরভাবে নিজের প্রভাববলয়ে টেনে নিতেন এবং নিউ ইয়র্ক ও তার ক্যারিবীয় দ্বীপে আয়োজিত লম্পট ও শোষণমূলক ব্যক্তিগত পার্টির জগতে ঢুকিয়ে দিতেন।
ধারণা করা হচ্ছে, আরও ত্রিশ লক্ষ নথি এখনও গোপন রাখা হয়েছে। সেগুলোর বিষয়বস্তু নিশ্চয়ই আরও বেশি ক্ষতিকর বৈশ্বিক অভিজাতদের জন্য, যাদের এপস্টিন লালন করেছিলেন। যত বেশি নথি সামনে আসছে, তত বেশি একটি চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে, কীভাবে এপস্টিনকে তার অপরাধের পরিণতি থেকে রক্ষা করেছিল মিত্রদের এই নেটওয়ার্ক, যারা হয় তার অপরাধ উপভোগ করেছে, নয়তো এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে।
এপস্টিনের কার্যপদ্ধতি সন্দেহজনকভাবে এক গ্যাংল্যান্ড বসের মতো ছিল, যে নতুন সদস্যদের পূর্ণ সদস্য হওয়ার আগে একটি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করে। জড়িত থাকা ষড়যন্ত্রমূলক নীরবতা নিশ্চিত করার জন্য এটা সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
ক্ষমতার নেটওয়ার্ক:
শুধু এই নয় যে বহু দশক ধরে এই শিশুকামী অর্থলগ্নিকারী সবার আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। তার বন্ধু ও পরিচিতদের নেটওয়ার্কও তার সঙ্গে লুকিয়ে ছিল। সবাই ধরে নিয়েছিল তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তরুণী নারী ও কিশোরীদের ওপর তার নির্যাতন শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ ছিল না। প্রশ্ন হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত কাদের জন্য তিনি ও তার প্রধান দালাল গিসলাইন ম্যাক্সওয়েল এই যৌন পাচার করছিলেন?
এ কারণেই প্রকাশিত লক্ষ লক্ষ নথির অনেকগুলো সতর্কভাবে কালো দাগ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, প্রধানত ভিকটিম বা ভুক্তভোগীদের রক্ষার জন্য নয়। বরং সেই শিকারি চক্রগুলোকে রক্ষার জন্য, যাদের তিনি সেবা দিতেন। যদিও তাদের পরিচয় এখন মোটামুটি প্রকাশিত।
সর্বশেষ প্রকাশিত এপস্টিন নথিগুলোর উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এগুলো এমন এক বিশ্বদৃষ্টির ইঙ্গিত দেয় যা সাধারণত “ষড়যন্ত্র তত্ত্ববাদীদের” সঙ্গে যুক্ত। এপস্টিন ছিল এক বৈশ্বিক ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে, তথাকথিত বাম ও ডান রাজনৈতিক বিভাজনের উভয় দিক থেকেই।কিন্তু বাস্তবে তা বেশিরভাগই অভিনয়মূলক
যে অভিজাতরা একসময় এপস্টিনকে তাদের রিংমাস্টার হিসেবে মূল্য দিত, তারাই এখন আমাদের মনোযোগ তাদের অপরাধে জড়িত থাকার বিষয় থেকে সরিয়ে নিতে চাইছে।
যে আঠা এই ব্যক্তিদের অনেককে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছিল বলে মনে হয়, তা ছিল অসহায় তরুণী নারী ও কিশোরীদের প্রতি তাদের নির্যাতনমূলক আচরণ।
একইভাবে, ধনী পুরুষদের তরুণীদের সঙ্গে ছবি ইঙ্গিত দেয় যে, এপস্টিন হয় আনুষ্ঠানিকভাবে নয়তো অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘কমপ্রোম্যাট’ অর্থাৎ অপরাধপ্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন, যা তাদের ওপর সম্ভাব্য চাপ হিসেবে কাজে লাগতে পারত।
একেবারে মেসনিক ধাঁচে, তার সহচরদের বৃত্ত যেন একে অন্যকে রক্ষা করেছে। এপস্টিন নিজেও ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় একটি “সুইটহার্ট ডিল” থেকে লাভবান হন। যৌন পাচারের গুরুতর অভিযোগগুলোর বদলে তাকে কেবল দেহব্যবসা আহ্বানের দুইটি অপেক্ষাকৃত হালকা অভিযোগে দোষী করা হয় এবং স্বল্প মেয়াদের সাজা হয়, যার বড় অংশই ছিল বিনাশ্রমের সুবিধাসহ।
আর কীভাবে এপস্টিন, যিনি এক অর্থে একজন আড়ম্বরপূর্ণ হিসাবরক্ষক, তার চমকপ্রদ বিলাসী জীবনযাত্রার অর্থ জোগাতেন, যখন তার সময়সূচি যেন ই-মেইল ও পার্টি আয়োজনেই ভরা ছিল। প্রতিটি নতুন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্নের রহস্য কিছুটা করে কমছে।
অতিধনীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তাদের অনুসারীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তরুণীদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া, এসবই গুপ্তচর সংস্থাগুলোর প্রচলিত হানিট্র্যাপ কৌশলের মতো। সম্ভবত সবকিছুর অর্থায়ন তিনি নিজে করতেন না।
ইসরায়েলের ছাপ:
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আবারও সর্বশেষ নথি প্রকাশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর, বিশেষভাবে ইসরায়েলের ছাপ দেখা যাচ্ছে। তবে ইঙ্গিতগুলো আগে থেকেই ছিল। তার ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যার মিডিয়া টাইকুন বাবা মৃত্যুর পর ইসরায়েলি এজেন্ট হিসেবে প্রকাশিত হন। আর এপস্টিনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এহুদ বারাক, সেটাও একটি সতর্ক সংকেত হওয়া উচিত ছিল। তিনি আগে ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা প্রধান এবং পরে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এই অংশীদারিত্ব গত শরতে প্রকাশিত আগের নথি থেকে ড্রপ সাইট নিউজের একাধিক প্রতিবেদনে উঠে আসে। সেখানে দেখা যায় যে, এপস্টিন ইসরায়েলকে মঙ্গোলিয়া, কোট দিভোয়ার ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি করতে সহায়তা করেছিলেন।
২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ইয়োনি কোরেন নামে এক সক্রিয় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এপস্টিনের ম্যানহাটন অ্যাপার্টমেন্টে বারবার অতিথি ছিলেন। একটি ই-মেইলে বারাককে কোরেনের হিসাবে টাকা পাঠাতে বলতেও দেখা যায়।
সর্বশেষ প্রকাশে আরও সূত্র মিলেছে। এক ডিক্লাসিফায়েড এফবিআই নথিতে এক গোপন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, এপস্টিন বারাকের “ঘনিষ্ঠ” ছিলেন এবং “তার অধীনে গুপ্তচর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন”।
২০১৮ সালের এক ই-মেইল আদানপ্রদানে, কাতারি বিনিয়োগ তহবিলের সঙ্গে বৈঠকের আগে এপস্টিন বারাককে বলেন, তিনি যেনো তাদের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ দূর করেন: তিনি বলেন, “তোমার পরিষ্কার করে বলা উচিত আমি মোসাদের জন্য কাজ করি না।”
এক নতুন প্রকাশিত, তারিখবিহীন অডিওতে এপস্টিন বারাককে যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির সম্পর্কে আরও জানার এবং এর প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দেন। ২০২৪ সালে ইসরায়েল গাজায় লক্ষ্য নির্বাচন করতে সেনাবাহিনীকে সহায়তা দেওয়ার জন্য প্যালান্টিরের সঙ্গে এআই সেবার চুক্তি করে।
অবশ্যই, এসবের প্রকাশ তথাকথিত মূলধারার মিডিয়ায় প্রায় কোনো সাড়া পাচ্ছে না। সেই একই মিডিয়া, যার বিলিয়নিয়ার মালিক ও ক্যারিয়ারমুখী সম্পাদকরা একসময় এপস্টিনকে তোষামোদ করত। বরং মিডিয়া বেশি ব্যস্ত দুর্বল সূত্র নিয়ে, যা ইঙ্গিত দেয় এপস্টিনের রুশ নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গেও নাকি যোগাযোগ ছিল।
ফাউস্টীয় চুক্তি:
এপস্টিন নথির দাবি এত প্রবল হওয়ার কারণ আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও তা প্রকাশে বাধ্য হতে হয়েছে, যদিও এতে তার জন্যও বিব্রতকর তথ্য ছিল। আমাদের ক্রমশ অধঃপতিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিতে যা ঘটছে তার অনেক কিছুই যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা তো দূরের কথা, নৈতিক ব্যাখ্যাও অস্বীকার করে।
পশ্চিমা অভিজাতরা দুই বছর ধরে গাজায় গণহত্যায় সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছে — যা বিশেষজ্ঞরা ব্যাপকভাবে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারা এসবের বিরোধিতাকারীদের সন্ত্রাসবাদী বা ইহুদিবিদ্বেষী বলে আখ্যা দিয়েছে।
এই একই অভিজাতরা বসে বসে দেখে যখন পৃথিবী জ্বলছে, তারা জীবাশ্ম জ্বালানির মুনাফালোভী আসক্তি ছাড়তে অস্বীকার করে। যদিও জরিপের পর জরিপে দেখা যাচ্ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে এমন পর্যায়ে যে জলবায়ু বিপর্যয় অনিবার্য।
মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক বেপরোয়া ও অবৈধ পশ্চিমা আগ্রাসী যুদ্ধ এবং ন্যাটোর দীর্ঘদিনের উস্কানি যা রাশিয়াকে ইউক্রেন আক্রমণে প্ররোচিত করেছে, তা শুধু বিশ্বকে অস্থিতিশীল করেনি বরং পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞ সতর্কতা সত্ত্বেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত চালু করা হচ্ছে, সমাজে সম্ভাব্য বিপুল খরচের কথা প্রায় ভাবা ছাড়াই, চাকরির বাজার ধ্বংস করা থেকে শুরু করে সত্য যাচাইয়ের ক্ষমতা উল্টে দেওয়া পর্যন্ত।
এপস্টিন নথি একটি উত্তর দেয়। তা ইঙ্গিত দেয়, যা ষড়যন্ত্র মনে হয় তা আসলেই ষড়যন্ত্র, আর তা লোভ দ্বারা চালিত। যা সবসময় চোখের সামনে ছিল, তা হয়তো সত্যিই ঠিক: পশ্চিমের ক্ষুদ্র ক্ষমতাধর অভিজাত গোষ্ঠীতে গ্রহণযোগ্য হতে একটি উচ্চ মূল্য দিতে হয়, আর তা হলো নৈতিকতা পাশে সরিয়ে রাখা। এর জন্য দরকার গোষ্ঠীর বাইরের কারও প্রতি সহানুভূতি ত্যাগ করা। তারা সম্ভবত সমাজের নিয়ন্ত্রণে এক আত্মাহীন, মাংসভোজী অভিজাত শ্রেণি —যারা ধারণার চেয়ে কম কার্টুনসুলভ। হয়তো এপস্টিন নথি আমাদের কল্পনায় এত জায়গা করে নিয়েছে, কারণ এগুলো এমন এক শিক্ষা দেয় যা আমরা আগেই জানতাম। এগুলো এমন এক সতর্কবার্তা নিশ্চিত করে, যা পশ্চিমের সাহিত্যধারারও আগের।
চার শতাব্দীরও বেশি আগে ইংরেজ লেখক ক্রিস্টোফার মার্লো জার্মান লোককাহিনী অবলম্বনে “ডক্টর ফাউস্টাস” নাটক লেখেন, যেখানে এক পণ্ডিত মেফিস্টোফিলিসের মাধ্যমে জাদুশক্তির বিনিময়ে নিজের আত্মা শয়তানের কাছে বিক্রি করতে সম্মত হয়।এভাবেই জন্ম নেয় “ফাউস্টীয় চুক্তি”, এপস্টিনসদৃশ মধ্যস্থতাকারী মেফিস্টোফিলিসের মাধ্যমে। পরে জার্মান লেখক ইয়োহান উলফগাং ফন গ্যেটে তার দুই খণ্ডের শ্রেষ্ঠ রচনা “ফাউস্ট”-এ এই কাহিনী পুনরায় রচনা করেন।
পতিত যুক্তি:
তবে আশ্চর্যের নয়, এপস্টিন নথি নিয়ে মিডিয়ার কোলাহল মূলত আরও সত্য গল্পকে চাপা দিচ্ছে। যে অভিজাতরা একসময় এপস্টিনকে তাদের রিংমাস্টার বানিয়েছিল, তারাই এখন আমাদের মনোযোগ তাদের অপরাধে জড়িত থাকার বিষয় থেকে সরিয়ে কয়েকজন নির্বাচিত ব্যক্তির দিকে নিতে চাইছে — বিশেষভাবে যুক্তরাজ্যে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর ও পিটার ম্যান্ডেলসনের দিকে। এই দুজনকে বলি দেওয়ার পাঁঠা বলা যায় না। তবুও তারা একই উদ্দেশ্য পূরণ করে, যার উদ্দেশ্য জনতার প্রতিশোধস্পৃহা সাময়িকভাবে শান্ত করা।
এদিকে তার বৃত্তের বাকিরা হয় তাদের বন্ধুত্ব অস্বীকার করছে, নয়তো কোণঠাসা হলে সামান্য ভুলের জন্য তাড়াহুড়ো করে ক্ষমা চেয়ে আড়ালে চলে যাচ্ছে।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে, শিশুদের কষ্ট, গাজায় হোক বা কোনো বিলিয়নিয়ারের প্রাসাদে হোক, তাতে কী আসে যায়?
এটি একটি ভ্রান্ত হিসাব। এপস্টিন নথি শুধু কয়েকজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির অন্ধকার সিদ্ধান্ত দেখায় না। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, এগুলো সেই ক্ষমতাকাঠামোর অধঃপতিত যুক্তি তুলে ধরে যা তাদের পেছনে কাজ করে।
যে ক্ষমতাবানরা এপস্টিনের “ললিতা এক্সপ্রেস”-এ চড়ে তার দ্বীপে গিয়েছিল, যারা পাচার হওয়া তরুণীদের কাছ থেকে “মেসেজ” নিয়েছিল এবং যারা এসব নির্যাতন নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছিল, তারাই একই মানুষ যারা গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যাকে নীরবে সমর্থন করেছে, কখনও উচ্চস্বরে সমর্থনও দিয়েছে।
যারা গাজায় হাজার হাজার শিশুর হত্যার বিরুদ্ধে একটি শব্দও বলেনি, বা লক্ষাধিক শিশুর অনাহার উপেক্ষা করেছে — তারা কি ঘরের কাছেই শিশু নির্যাতনের আচারেও জড়িত ছিল বা তা মেনে নিয়েছিল? এতে আমরা কি অবাক?
এই তারাই যারা গাজার শিশুদের পক্ষে কথা বলতে চাইলে মানুষকে বাধ্য করেছে আগে হামাসকে নিন্দা করতে। এই তারাই যারা শিশু মৃত্যুর বাড়তে থাকা সংখ্যা অস্বীকার করতে চেয়েছে “হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়” বলে দায় চাপিয়ে। এই তারাই যারা হাসপাতাল লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা অস্বীকার করেছে এবং পুরো জনগোষ্ঠীকে অনাহারে রাখার ঘটনাও উপেক্ষা করেছে। আর এই তারাই এখন ভান করছে যে, ইসরায়েলের শিশু হত্যা ও নির্যাতন হচ্ছে আসলে “শান্তি পরিকল্পনা”।
নিওলিবারেলবাদ ও জায়নবাদ:
এক মুহূর্তের জন্য তার শিশুকামিতা বাদ দিন। এপস্টিন ছিল পশ্চিমা সমাজে প্রভাবশালী দুই মতাদর্শ নিও-লিবারেলবাদ ও জায়নবাদের চূড়ান্ত প্রতিরূপ। এই কারণেই সে এতদিন তাদের উচ্চস্তরে সফল ছিল।
এই মতাদর্শগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য বা গন্তব্য ছিল গাজায় গণহত্যা এবং ভবিষ্যতে যদি থামানো না যায় তবে বৈশ্বিক পারমাণবিক ধ্বংস বা জলবায়ু বিপর্যয়। সাধারণ মানুষকে ডুবন্ত জাহাজে ফেলে রেখে বিলিয়নিয়াররা লাইফবোট দখল করবে।
এপস্টিন আমাদের সতর্কবার্তা হতে পারত পশ্চিমের রাজনৈতিক ও আর্থিক সংস্কৃতির গভীর অসুস্থতার বিষয়ে। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতেও সেই সতর্কবার্তা চাপা পড়ছে, যেমনটা তার জীবদ্দশায়ও পড়েছিল।
নিও-লিবারেলবাদ হলো অর্থ ও ক্ষমতার জন্য অর্থ ও ক্ষমতারই অনুসরণ, যা কোনো উচ্চতর উদ্দেশ্য বা সামাজিক কল্যাণ থেকে বিচ্ছিন্ন। গত অর্ধশতকে পশ্চিমা সমাজকে উৎসাহিত করা হয়েছে বিলিয়নিয়ার, শিগগিরই ট্রিলিয়নিয়ার, শ্রেণিকে অগ্রগতি ও উন্নতির চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে পূজা করতে এবং তা একটি পচে যাওয়া ব্যবস্থার চিহ্ন হিসেবে নয়।
অতিধনীরা ও তাদের অনুসারীরা স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়েছে “লংটার্মিজম” মতবাদের প্রতি, যা বর্তমানের বৈষম্য ও অন্যায়কে ন্যায্যতা দেয় এবং ভবিষ্যৎ পরিবেশ বিপর্যয় মেনে নেয়।
এই মতবাদ বলে মানবতার মুক্তি বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে নয়, বরং তা হবে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য অর্জনে, তথাকথিত শ্রেষ্ঠ মানুষদের মাধ্যমে।
এক ক্ষুদ্র আর্থিক অভিজাত শ্রেণির পূর্ণ স্বাধীনতা দরকার আরও সম্পদ জমানোর জন্য, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে টিকে থাকার সমাধান খুঁজতে। বাকিরা তাদের পথে বাধা।
সাধারণ মানুষকে ডুবন্ত জাহাজে ফেলে রেখে বিলিয়নিয়াররা লাইফবোট দখল করবে। অক্সফোর্ডের দার্শনিক নিক বোস্ট্রমের ভাষায়, সামনে যা আছে তা “মানুষের জন্য এক বিশাল হত্যাযজ্ঞ, মানবজাতির জন্য সামান্য ভুল পদক্ষেপ”।
ভিডিও গেমের ভাষায় বললে, নিও-লিবারেল অভিজাতরা বাকিদের দেখে নন-প্লেয়ার চরিত্র বা এনপিসি হিসেবে, শুধু পটভূমির চরিত্রে। এই বৃহত্তর কাঠামোতে শিশুদের কষ্ট, তা গাজায় বা কোনো প্রাসাদে হোক, তাতে কী আসে যায়?
নৈতিক বিচ্যুতি নয়:
যদি এটি ঐতিহ্যগত “সাদা মানুষের বোঝা” উপনিবেশবাদের মতো শোনায়, আধুনিক রূপে, সেটাই কারণ। এ কারণেই নিওলিবারেলবাদ সহজেই আরেক উপনিবেশবাদী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত হয়, যা হচ্ছে জায়নবাদ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জায়নবাদ ক্রমশ বৈধতা পায়, যদিও তা ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের একই যুক্তি ধরে রাখে যা আগে নাৎসিবাদে পৌঁছেছিল।
ইসরায়েল শুধু আর্য শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিচ্ছবি নয়, বরং তার নিজস্ব সংস্করণ — ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ব — গ্রহণযোগ্য করেছে। জায়নবাদ অন্যান্য জাতিগত জাতীয়তাবাদের মতোই ঐক্য দাবি করে “অন্যের” বিরুদ্ধে, সামরিকতাকে সর্বোচ্চ মূল্য দেয়, এবং ভূখণ্ড সম্প্রসারণ চায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ঠেকাতে যে আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, সেটির অগ্রগতি বহু দশকে উল্টে দিয়েছে ইসরায়েল — এতে কি অবাক হওয়ার কিছু আছে?
বিশ্বের সামনে প্রকাশ্যে গণহত্যা চালিয়েছে ইসরায়েল — এবং পশ্চিম তা থামাতে ব্যর্থই নয়, বরং সহযোগিতা করেছে — এতে কি অবাক হওয়ার কিছু আছে?
ইসরায়েলের প্রকৃত চরিত্র আড়াল করা কঠিন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম আরও দমনমূলক ও কর্তৃত্ববাদী হয়েছে — এতে কি অবাক হওয়ার কিছু আছে?
প্যালেস্টিনীয়দের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইসরায়েল যে অস্ত্র, নজরদারি প্রযুক্তি ও জননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করেছে, সেগুলোই পশ্চিমা বিলিয়নিয়ার শ্রেণির কাছে এত মূল্যবান — এতে কি অবাক হওয়ার কিছু আছে?
এই কারণেই যুক্তরাজ্যের এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি গাজায় ইসরায়েলের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন এবং বিরোধিতাকে সন্ত্রাসবাদ বলেছিলেন, এখন ১৮শ শতকের প্যানঅপটিকন কারাগারের ধারণা পুনরুজ্জীবিত করতে চান — তবে এআই সংস্করণে — যাতে “রাষ্ট্রের চোখ সবসময় আপনার ওপর থাকে”।
প্রায় দুই দশক আগে পরিষ্কার হয়েছিল এপস্টিন এক শিকারি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাকে নৈতিক বিচ্যুতি বলে দেখার ধারণা আর টেকেনি। তিনি বিকৃত যৌন তৃপ্তির মাধ্যমে এক বৃহত্তর দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্কৃতির প্রতিফলক ছিলেন — যে সংস্কৃতি বিশ্বাস করে বিশেষ মানুষের জন্য নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
তার কিছু সবচেয়ে সহজে ত্যাগযোগ্য সহযোগীকে এখন বলি দেওয়া হবে জনতার জবাবদিহির চাহিদা মেটাতে। কিন্তু ভুলবেন না: এপস্টিন সংস্কৃতি এখনও বহাল। -জোনাথন কুক, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত বিষয়ক তিনটি বইয়ের লেখক এবং সাংবাদিকতায় মার্থা গেলহর্ন বিশেষ পুরস্কার-এর বিজয়ী। তার ওয়েবসাইট ও ব্লগ পাওয়া যাবে www.jonathan-cook.net ঠিকানায়।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button