উপসাগরে ইরান-সমীকরণ বদলে দিয়েছে বেইজিং ও মস্কো
হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইংয়ের সুরক্ষিত পরিবেশে, গত জুনে সংঘটিত “টুয়েলভ-ডে ওয়ার”-এর (১২ দিনের যুদ্ধ) ছায়া এখনো সিচুয়েশন রুমে ভাসমান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য লক্ষ্য অপরিবর্তিত: ইরান যেন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে, তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ভেঙে দেয় এবং তথাকথিত “অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স” থেকে নিজের সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিন্তু ওয়াশিংটন যখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলি নিরাপত্তা অগ্রাধিকার ও জায়োনিস্ট দাতা গোষ্ঠীর চাহিদা অনুযায়ী নীতি অনুসরণ করছে, তখন স্থল ও সমুদ্র—উভয় ক্ষেত্রেই বাস্তবতা বদলে গেছে। কারণ, উদীয়মান ত্রিমুখী বিশ্বব্যবস্থা এখন নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে পররাষ্ট্র নীতির প্রতিষ্ঠানের সতর্ক বাস্তববাদী অবস্থান, অন্যদিকে এমন এক দাতা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক চাপ, যাদের কাছে ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ অনিবার্য, এই দুইয়ের মধ্যে আটকে আছে। গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পরোয়ানার ছায়ায় থাকা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক হোয়াইট হাউস সফর ছিল সর্বোচ্চ কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় ভরপুর।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই স্পষ্টভাবে বলেছেন: “আমি আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে মাথা ঘামাই না, কেবল আমার নৈতিকতা নিয়ে ভাবি”—যা বর্তমান মার্কিন নীতির আদর্শিক ভিত্তি স্পষ্ট করে।
জানুয়ারির স্থগিত অভিযানটি কোনো “কৌশলী চাল” ছিল না, যেমন অনেকে দাবি করেছিলেন। বরং মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে পারস্য উপসাগরের যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা মৌলিকভাবে বদলে গেছে। চীনের টাইপ ০৫৫ “সুপার ডেস্ট্রয়ার” ও সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স জাহাজ ওমান উপসাগরে মোতায়েন হওয়ায় মার্কিন বাহিনীর দীর্ঘদিনের কৌশলগত চমক দেওয়ার ক্ষমতা কার্যত শেষ হয়েছে।
এখন প্রশ্ন আর এ নয় যে ওয়াশিংটন জোরপূর্বক ইরানকে নতজানু করতে পারবে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, এমন এক পরিবেশে—যেখানে খরচ বহুগুণ বেড়েছে এবং সাফল্যের সম্ভাবনা কমেছে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক বিকল্প ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে কি না।
নতুন সামুদ্রিক ঢাল:
টাইপ ০৫৫ শ্রেণির জাহাজ—যাকে অনেক নৌ-বিশ্লেষক বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পৃষ্ঠ-যুদ্ধজাহাজ হিসেবে বিবেচনা করেন—এর মোতায়েন কেবল “নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা” প্রদর্শন নয়। টাইপ ০৫৫ ও লিয়াওওয়াং-১ নজরদারি জাহাজ ওমান উপসাগরে অবস্থান নেওয়ায় ইরান এখন মার্কিন নৌবাহিনীর গতিবিধির ওপর ২৪ ঘণ্টার “ঈশ্বরের দৃষ্টি” পাচ্ছে। চীনের বেইদৌ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ইরান এখন এমন গোয়েন্দা সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা ন্যাটোর শীর্ষ সদস্যদের সমতুল্য।
একজন পেন্টাগন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রতিটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের গতিবিধি, প্রতিটি আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহ রুট, প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ক্রুজারের অবস্থান পরিবর্তন—সবকিছু এখন প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে তেহরানের নজরে আসে। আমরা দশকের পর দশক ধরে যে কৌশলগত চমকের ওপর নির্ভর করেছি, তা হারিয়ে ফেলেছি।”
বেইজিংয়ের জন্য এটি আদর্শিক অবস্থান নয়, বরং কৌশলগত হিসাব। ইরান হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের পশ্চিমাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল ও অপরিহার্য জ্বালানি সরবরাহকারী। এটিকে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণে যেতে দেওয়া চীনের জন্য অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় হবে, যা তারা হতে দিতে প্রস্তুত নয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি কিউবা প্রসঙ্গে যে বিবৃতি দিয়েছে, তা ইরানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য: “জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।”
রাশিয়ার “অদৃশ্য” সহায়তা:
মস্কোর ভূমিকা চীনের মতো দৃশ্যমান না হলেও তা সমান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ১২ দিনের সংঘাতে, যখন ইসরায়েলি ও মার্কিন সাইবার হামলায় ইরানের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বিপর্যস্ত হয়, তখন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রুশ প্রযুক্তি দল ইরানে পৌঁছে যায় এবং অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করে। চীন যেখানে সমুদ্র রক্ষা করছে, রাশিয়া সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুরক্ষিত করছে। ২০২৫ সালের জুনে যুদ্ধবিরতির পর থেকে রুশ সামরিক কার্গো ফ্লাইটে যে সহায়তা এসেছে, তাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, উন্নত এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সাইবার আক্রমণ প্রতিরোধী এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং রুশ প্রোটন-এম রকেটে উৎক্ষেপিত জাম-এ জাম ১ স্যাটেলাইট, যা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন অবস্থায়ও আঞ্চলিক সমন্বয় সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
নতুন বাস্তবতার উদ্ভব:
প্রতিমাসে ইরান-চীন-রাশিয়ার সামরিক, অর্থনৈতিক ও গোয়েন্দা সমন্বয় আরও গভীর হচ্ছে। এটা একসময় ছিল কৌশলগত সহযোগিতা, তা এখন কৌশলগত জোটে রূপ নিচ্ছে এবং তা প্রতিরোধ করা ছিল মার্কিন নীতির দীর্ঘদিনের লক্ষ্য।
ওয়াশিংটনের বর্তমান আলোচনার অবস্থান এখন কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েছে, যা কার্যত নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শর্তের মতো। ইরান নিজেকে এমন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দেখছে, যা মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করছে এবং এখন বৃহৎ শক্তির প্রযুক্তিগত সহায়তায় সমৃদ্ধ হয়ে আত্মসমর্পণের কোনো বাধ্যবাধকতা অনুভব করছে না।
যদি ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি “ধ্বংস” করার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে তিনি অতীতের ইরানের মুখোমুখি হবেন না বরং এমন এক ইরানের মুখোমুখি হবেন, যা চীন-রাশিয়ার গোয়েন্দা ছাতার নিচে পরিচালিত হচ্ছে। আর যেখানে প্রতিটি মার্কিন নৌ-চলাচল তেহরানের কাছে দৃশ্যমান।
ইরান-চীন-রাশিয়ার যৌথ নৌ-মহড়া ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে “নতুন অক্ষ” ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: পারস্য উপসাগর আর এককভাবে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এবং ইসরায়েল-প্রভাবিত নীতি বাস্তবায়নের খরচ হয়তো খুব শিগগিরই এই প্রশাসনের জন্য অত্যধিক হয়ে উঠবে।
সিচুয়েশন রুমে এখন যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো—নীতিনির্ধারকরা কি এই নতুন বাস্তবতা উপলব্ধি করবেন, নাকি তা পরীক্ষা করতে গিয়ে আরও ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হবেন? -জাসিম আল-আজ্জাওয়ি, একাধিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে এমবিসি, আবু ধাবি টিভি এবং আল জাজিরা ইংলিশ— যেখানে তিনি সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক ও নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত কভার করেছেন, বিশ্বনেতাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এবং গণমাধ্যম বিষয়ক কোর্সও পড়িয়েছেন।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



