যেভাবে আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ বর্ণবৈষম্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলো

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও এর আশপাশে বিমান হামলা চালায়। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে দেশ থেকে সরিয়ে নিয়েছে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রে আনা অভ্যন্তরীণ ফৌজদারি অভিযোগ এবং একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক প্রকল্পের কথা বলা হয়, যার লক্ষ্য একটি তথাকথিত “ট্রানজিশন”-এর সময় ভেনেজুয়েলাকে “পরিচালনা” করা। এখানে আমরা আবারও এমন এক আচরণের আদর্শ উদাহরণের মুখোমুখি হই, যেটিকে ১৯৪৫-পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা অবৈধ ঘোষণা করতে চেয়েছিল। এই আইন ব্যবস্থা এটা করতে চেয়েছিলো একতরফা শক্তির ব্যবহারকে প্রতিস্থাপন করে সমষ্টিগত নিরাপত্তা, সার্বভৌম সমতা এবং আইনি সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের ধারণা প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে।
এখন কল্পনা করুন, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র সীমান্ত অতিক্রম করছে, একটি রাজধানীতে বোমা হামলা চালাচ্ছে, রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করছে, এবং পরে সেই কাজটিকেই “আইন প্রয়োগ” হিসেবে পুনর্লিখন করছে। এটি কি কেবল আন্তর্জাতিক আইনের একটি আগ্রাসী ব্যাখ্যা, নাকি আরও গভীর ও ভয়াবহ কিছু? এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বৈধতা নির্ধারিত হয় নীতির ভিত্তিতে নয়, বরং সক্ষমতার ভিত্তিতে? যদি তাই হয়, তবে এই ধারা আমাদের অস্বস্তিকরভাবে পরিচিত বলেই মনে হওয়ার কথা।
আইনের অবস্থান এখানে স্পষ্ট। জাতিসংঘ সনদ কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা তার হুমকি—উভয়ই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক আইনশাস্ত্র ও নীতিতে এটি আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় এক অপরিবর্তনীয় নীতি হিসেবে স্বীকৃত।
এই নিষেধাজ্ঞার ব্যতিক্রম ইচ্ছাকৃতভাবেই অত্যন্ত সীমিত এবং মাত্র দুটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রথমত, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধ্যায় ৭-এর অধীনে অনুমোদন—যা কেবলমাত্র সমষ্টিগতভাবে বলপ্রয়োগের বৈধতা দেয়। দ্বিতীয়ত, সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আত্মরক্ষার স্বাভাবিক অধিকার—যা কেবলমাত্র বাস্তব সশস্ত্র হামলার প্রতিক্রিয়ায় কার্যকর হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ধারাবাহিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই অধিকার আরও সীমাবদ্ধ প্রয়োজনীয়তা, তাৎক্ষণিকতা ও আনুপাতিকতার নীতির দ্বারা।
কিন্তু এখানে এই দুটি ব্যতিক্রমের কোনোটি পূরণ হচ্ছে না। নিরাপত্তা পরিষদের কোনো সমষ্টিগত অনুমোদনের ইঙ্গিত নেই এবং ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকে এমন কোনো সশস্ত্র হামলার কথাও নেই, যা আত্মরক্ষার যুক্তিকে সক্রিয় করতে পারে। বরং যেসব যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো হলো ফৌজদারি দায়, রাজনৈতিক অবৈধতা কিংবা কৌশলগত প্রয়োজন—যেগুলোকে আন্তর্জাতিক আইন ধারাবাহিকভাবে একতরফা বলপ্রয়োগের বৈধ ভিত্তি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
শাসন পরিবর্তন, সীমান্ত অতিক্রম করে আইন প্রয়োগ, কিংবা শাস্তিমূলক হস্তক্ষেপ—এর কোনোটিই বলপ্রয়োগ নিষেধাজ্ঞার স্বীকৃত ব্যতিক্রম নয়। একে “গ্রে জোন” বলা মানে আইনি কাঠামোকেই ভুলভাবে উপস্থাপন করা। এটি ঠিক সেই অঞ্চল, যাকে জাতিসংঘ সনদ অবৈধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। কারণ একবার যদি বলপ্রয়োগকে সমষ্টিগত অনুমোদন বা প্রকৃত আত্মরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক প্রতিশ্রুতি—রাষ্ট্রের সমান সার্বভৌমত্ব এবং একতরফা সহিংসতার বদলে আইনি নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে।
এখানেই আইনি আনুষ্ঠানিকতার সীমা স্পষ্ট হয়
রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণা হলো—বৈধতা আসে তখনই, যখন সমাজ সম্মিলিতভাবে স্বীকার করে যে জবরদস্তি ক্ষমতা নিয়মের দ্বারা সীমাবদ্ধ এবং বলপ্রয়োগ তখনই কর্তৃত্বে পরিণত হয়, যখন তা প্রক্রিয়া ও পূর্বানুমেয়তার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, খামখেয়ালিপনার মাধ্যমে নয়।
আন্তর্জাতিক সমাজে কোনো একক সর্বময় বিচারিক ক্ষমতা নেই। বরং থাকা উচিত একটি যৌথ—যদিও ভঙ্গুর ও অসম্পূর্ণ—সম্মতি যে বলপ্রয়োগ ব্যতিক্রম, নিয়ম নয় এবং এর ব্যবহার সমষ্টিগতভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।
কিন্তু যখন একটি বড় শক্তি ব্যতিক্রমকে স্থায়ী অধিকার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন পুরো ব্যবস্থা একটি বৈধতা সংকটে পড়ে। তখন বিশ্বাস ভেঙে যায় যে নিয়ম এমনকি সবচেয়ে শক্তিশালীদেরও বেঁধে রাখে। সেই মুহূর্তে আইন হয়ে ওঠে নাটক—যখন সুবিধাজনক, তখন উদ্ধৃত; যখন ব্যয়বহুল, তখন উপেক্ষিত।
কিন্তু এই নাটক নিরীহ নয়। আচার বাস্তবতাকে গঠন করে। যদি “আন্তর্জাতিক বৈধতা”-র আচার বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়, তবে দর্শকরা আসল চিত্রটি বুঝে যায়—যেখানে নিরাপত্তা অধিকার নয়, বরং পক্ষপাতের ওপর নির্ভরশীল।
ফৌজদারি আইনের আড়ালে আগ্রাসন
কেউ কেউ এটিকে ঘরোয়া ফৌজদারি যুক্তিতে বৈধ করার চেষ্টা করবেন—মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযোগ, পুরস্কার ঘোষণা, এবং এটিকে সীমান্ত-পার পুলিশি কার্যক্রম হিসেবে উপস্থাপন। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন স্পষ্টভাবে প্রত্যর্পণ (রাষ্ট্রসম্মত আইনি প্রক্রিয়া) এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অপহরণের (সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন) মধ্যে পার্থক্য করে।
অভিযোগপত্রকে যদি আগ্রাসনের লাইসেন্স বানানো হয়, তবে তা কার্যত এই ঘোষণা যে একজন কৌঁসুলির নথি জাতিসংঘ সনদকে অগ্রাহ্য করতে পারে। এই নীতি যদি জন্ম নেয়, তবে তা কেবল আমেরিকান থাকবে না। এটি ছড়িয়ে পড়বে। অন্যান্য শক্তিও একে উদ্ধৃত করবে—এবং করবে সবচেয়ে অস্থিতিশীল মুহূর্তগুলোতেই।
যদি এই অভিযানে ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে মার্কিন ও ভেনেজুয়েলা বাহিনীর মধ্যে ধারাবাহিক সংঘর্ষ, হামলা ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (আইএইচএল) প্রযোজ্য হবে। কিন্তু আইএইচএল পুরোপুরি মানলেও অবৈধ বলপ্রয়োগ বৈধ হয়ে যায় না। এই দুটি বিষয় আলাদা। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—যুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হয় এবং যুদ্ধ আদৌ শুরু করা যাবে কি না—এই দুইকে গুলিয়ে ফেললেই মানবিক ভাষার আড়ালে আগ্রাসন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
সম্পদের ছায়ায় আইন ভাঙন
এই আইনি ভাঙনের পেছনে থাকা রাজনৈতিক অর্থনীতির কথাও ভাবা যাক। ভেনেজুয়েলার কাছে রয়েছে বিপুল হাইড্রোকার্বন সম্পদ—প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুত। ট্রাম্প নিজেই অভিযানের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেলের যোগসূত্র টেনেছেন—দেশ “পরিচালনা” এবং এর সম্পদ ব্যবহারের কথা বলে। যখন বলপ্রয়োগ প্রকাশ্যে সম্পদ শাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন আইনি বিপদের ঘণ্টা বেজে ওঠে।
এখানেই আইনের ক্ষয় স্পষ্ট হয়। যখন একতরফা বলপ্রয়োগের মূল নিষেধাজ্ঞা ঐচ্ছিক হয়ে যায়, তখন বলপ্রয়োগ কীভাবে হবে—তার ওপরের বিধিনিষেধও বাস্তবে দরকষাকষির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত যখন সংশ্লিষ্ট শক্তি কূটনৈতিক সুরক্ষা ও প্রয়োগগত অচলাবস্থার সুবিধা পায়।
গাজা ও ইরাকের মতো ক্ষেত্রে আমরা এটি আগেও দেখেছি। কার্যকর জবাবদিহির অভাব প্রাথমিক আগ্রাসনকে নির্বিঘ্নে এগোতে দেয়। এরপর প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও সময়সীমার আইনি সীমা কাগজে থাকে, কিন্তু বাস্তবে নমনীয় হয়ে যায়।
এই সব ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ ধারা দেখা যায়—নিয়মভিত্তিক সংযম থেকে ক্ষমতাভিত্তিক ব্যতিক্রমের দিকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়া। এটি নিরাপত্তার ভাষায় বর্ণিত হয়, সামরিক শক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, ভূখণ্ড ও জনগণের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করে, এবং এমন আইনি কাঠামো গড়ে তোলে যা ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ না করে বরং তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়।
এর দ্বারা ন্যায়সংগত হোক বা না হোক একটি উপসংহার টানা যায় যে, সম্পদের ওপর বসে থাকা সার্বভৌমত্ব এখন যেনো দরকষাকষিযোগ্য। আর এটাই চূড়ান্ত বিদ্রূপ। অসম্পূর্ণ ও অনেক সময় ভণ্ডামিপূর্ণ হলেও আন্তর্জাতিক আইন এই আশঙ্কা ঠেকাতেই গড়া হয়েছিল। যদি নিয়ম কেবল তাদেরই বাঁধে, যাদের বিমানবাহী রণতরী নেই, তবে যা অবশিষ্ট থাকে তা আন্তর্জাতিক স্তরবিন্যাস, শৃঙ্খলার পোশাক পরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি উচ্চ মহল। -তাতিয়ানা সভোরু, একজন অ্যাডভোকেসি–নির্ভর বিশ্লেষক, যিনি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাস্তুচ্যুতি–সংক্রান্ত প্রেক্ষাপটে কাজ করার অভিজ্ঞতা রাখেন। বাস্তুচ্যুতি, মানবিক নীতি এবং গণমাধ্যমের বয়ান নিয়ে তার কাজ মিডল ইস্ট মনিটর, লে মঁদ এবং ইন্ডিপেনডেন্ট অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button