আমিরাত–ইসরায়েলি ষড়যন্ত্রে ইয়েমেন কেনো প্রধান হাতিয়ার?

ইয়েমেনকে ঘিরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দ্বন্দ্ব বহুদিন ধরেই ধীরে ধীরে জ্বলছিল। তবে রিয়াদ তার স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে, যখন ইউএই এবং ইসরায়েলের মধ্যে গড়ে ওঠেছে নতুন জোট এবং বৃহত্তর ও ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে যৌথ নীতি।
এক দশকেরও বেশি আগে, সাবেক মার্কিন সেন্টকম কমান্ডার জেমস ম্যাটিস আবুধাবিকে স্মরণীয়ভাবে “লিটল স্পার্টা” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, কারণ এটি নিজের সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করছিল। ইরান ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল সংক্রান্ত বিষয় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তার রক্ষক হিসেবে দেখার মতো বিষয়ে তেল আবিবের সঙ্গে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এই দুই আঞ্চলিক অস্থিরতাকারী শক্তিকে কাছাকাছি এনেছে। ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে, এই ঘনিষ্ঠতা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
২০০৪ সালে সাবেক আমিরাতি শাসক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের মৃত্যুর পর ইউএই তার প্যান-আরবীয় ঐকমত্যভিত্তিক নীতি থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত এক পথে হাঁটতে শুরু করে। এই নতুন পথ নির্মাণ করেন তার পুত্র মোহাম্মদ বিন জায়েদ। তিনি তার পিতার উত্তরসূরির শাসনামলে পর্দার আড়ালের প্রধান শক্তি ছিলেন এবং ২০১৪ সাল থেকে কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, যা ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।
ম্যাটিস যে সামরিকতাবাদের কথা বলেছিলেন, তা ইসরায়েলের মতো কঠোর দমননীতি নয় বরং বিপুল তেলসম্পদের জোরে জনমতের তোয়াক্কা না করেই প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে হস্তক্ষেপ। বাস্তবে, ইউএই-এর মোট ১ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশকে নাগরিক হিসেবে রাখার নীতি দেশীয় বিরোধিতাকে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
তবে আরব বসন্ত শাসকগোষ্ঠীকে নাড়া দেয়। ইউএই নাগরিকদের মধ্যেও যারা সংখ্যায় কম ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল, তাদের মধ্যেও রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের দাবি উঠতে শুরু করে। মুসলিম ব্রাদারহুড-ঘনিষ্ঠ ইসলামপন্থি চিন্তাবিদরা, যারা স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্র প্রশাসনে উপস্থিত ছিলেন, শাসকদের চোখে হয়ে ওঠেন ‘উসকানিদাতা’। তাদের চোখে যারা মানুষকে তাদের সীমা ছাড়িয়ে ভাবতে শিখিয়েছে।
এরপর ইউএই সৌদি আরবের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অঞ্চলজুড়ে ইসলামপন্থি নির্বাচনী শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এসব শক্তি তুরস্ক ও কাতারের বিভিন্ন মাত্রার সমর্থন পাচ্ছিল। তারা মিশর থেকে লিবিয়া পর্যন্ত বিদ্যমান, এমনকি তুরস্ক নিজেও এতে ছিলো । তুরস্ক সরকারের সন্দেহ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টায় ইউএই-এর হাত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
ইউএই-এর কাছে ইসরায়েলের মতোই গাজা যুদ্ধ ছিল হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব শেষ করার একটি সুযোগ। ইউএই প্রেসিডেন্সিয়াল উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ অক্টোবরে বলেন, “ফিলিস্তিন প্রশ্নে চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি আর গ্রহণযোগ্য নয়।” যদিও হামাসসহ প্রধান ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যেই দুই রাষ্ট্র সমাধানে একমত, ফলে আসলে কী ছাড় আদায় করা হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়।
সামরিক হস্তক্ষেপ ও ইয়েমেনের হুথিদের সানা থেকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সৌদি আরবই ইউএই-কে সামরিক অংশীদার হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়। ২০১৪ সালে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) সমর্থিত সরকারকে হুথিরা উৎখাত করলে রিয়াদ শঙ্কিত হয়ে পড়ে। কারণ তার আশঙ্কা ছিলো তার সীমান্তে হুথিরা ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ-ধাঁচের এক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। সে কারণে সৌদি আরব ইয়েমেনের ইসলামপন্থি আল-ইসলাহ দলকে সমর্থন অব্যাহত রাখে।
মিশর ও পাকিস্তানসহ অন্য দেশগুলো এই যুদ্ধে সেনা পাঠাতে অনিচ্ছুক থাকায় যুদ্ধটি যে কাদায় আটকে যাবে, তা তারা আগেই আঁচ করেছিল। এ অবস্থায় রিয়াদের সামনে আবুধাবির শরণ নেওয়া ছাড়া তেমন কোন বিকল্প ছিল না। এতে ইউএই রাজি হয়, কিন্তু সৌদি আরবের আমিরাতি উদ্দেশ্য সম্পর্কে সরলতা ছিল চরম।
ইউএই-এর আগ্রহ দ্রুতই হুথিদের চ্যালেঞ্জ করার চেয়ে দক্ষিণ ইয়েমেনকে নিজেদের প্রভাবক্ষেত্র বানানোর দিকে মোড় নেয়। আর তা মূলত প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে। ২০১৫ সালে জায়ান্টস ব্রিগেড, ২০১৭ সালে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি), এবং পরে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস গঠিত হয় ইউএই-এর সহায়তায়। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে।
ইউএই ও সৌদি আরব দু’পক্ষই সুদানের আধাসামরিক র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএস এফ) থেকে ভাড়াটে সেনা নেয়। তবে ইউএই এই সম্পর্ক আরও গভীর করে—এমনকি এখন তারা সুদানের সরকারের বিরুদ্ধে আরএসএফকে সমর্থনের অভিযোগের সম্মুখীন, যদিও এই বাহিনীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ নৃশংসতার প্রমাণ রয়েছে।
ইউএই ইয়েমেনে ইসরায়েলের সঙ্গেও সহযোগিতা করেছে—সোকোত্রা, পেরিম, আবদ আল-কুরি ও জুকার দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি, রাডার ব্যবস্থা ও নজরদারি অবকাঠামো গড়ে তুলে। বিষয়টি নথিভুক্ত হলেও খুব কম আলোচিত।
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সোমালিল্যান্ড স্বীকৃতি এসেছে এই প্রেক্ষাপটে—যেখানে ইউএই বিচ্ছিন্ন এই অঞ্চলটিকে সড়ক নির্মাণ, বেরবেরা বন্দরের উন্নয়ন, হারগেইসা বিমানবন্দর আধুনিকীকরণ ও সামরিক ঘাঁটির মাধ্যমে শক্তিশালী করেছে, অথচ আনুষ্ঠানিকভাবে মোগাদিশুকে সমর্থনের ভান বজায় রেখেছে।
মুসলিম ব্রাদারহুড-ঘনিষ্ঠ ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক তুরস্ক দেশটি সোমালিয়া, সুদান, জিবুতি ও ইথিওপিয়ায় বড় বিনিয়োগসহ হর্ন অব আফ্রিকায় নিজস্ব সামরিক ও বাণিজ্যিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছে।
ইউএই দক্ষিণ ইয়েমেনেও একই কৌশলে একটি ‘সাত্রাপি’ (অধীন প্রদেশ) তৈরি করেছে, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র ও নির্বাসিত সরকারকে সমর্থনের ভান রাখা হচ্ছে। প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের অন্তত তিন সদস্যের (আইদারুস আল-জুবাইদি, আবদুলরহমান আল-মুহাররামি, ফারাজ আল-বাহসানি) প্রতি ইউএই-এর সমর্থন—যাদের দু’জনই এসটিসি বিচ্ছিন্নতাবাদী—এই পরিষদকে কার্যত অচল করে দিয়েছে।
সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণ হারানো এসটিসি নেতা আল-জুবাইদি ভালোভাবেই জানেন, স্বাধীনতা পেতে হলে তাকে ইউএই ও ইসরায়েলের সমর্থন দরকার—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সেই সংশয় কাটাতে, যারা ইতোমধ্যেই ইয়েমেনকে অতিরিক্ত ঝামেলাপূর্ণ দেশ হিসেবে দেখে।
গত এক বছরে জুবাইদি এই বয়ান জোরালোভাবে তুলে ধরছেন যে ইয়েমেনে এখন কেবল দুই শক্তি টিকে আছে: উত্তরে হুথি ও দক্ষিণে এসটিসি। পশ্চিমা দৃষ্টিতে দক্ষিণকে স্বীকৃতি দেওয়া নাকি দ্রুত স্থিতিশীলতা আনবে এবং ইরান-সমর্থিত হুথিদের আরও বিচ্ছিন্ন করবে—যাদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, তারা চীন ও রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে।
সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে জুবাইদি স্পষ্ট করে বলেন, তার ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর থেকেই রিয়াদ মনে করছে—হুথিদের সঙ্গে শান্তিই তাদের স্বার্থ রক্ষার সর্বোত্তম উপায়। বিশেষ করে আগামী দশকে ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে, যখন সৌদি আরব কঠোর রক্ষণশীলতা থেকে গণপর্যটনের দিকে এগোচ্ছে।
অক্টোবরে গাজা যুদ্ধবিরতি সৌদি আরবকে হুথিদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আলোচনা নীরবে পুনরায় শুরু করার সুযোগ দিয়েছে—যা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর স্থগিত ছিল। এসব আলোচনায় বাধা দেওয়া এসটিসি ও ইউএই-এর একটি প্রধান লক্ষ্য, কারণ সৌদি–হুথি চুক্তির পরই সরকার–হুথি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল, যেখানে নতুন ইয়েমেনে রাজস্ব—তেল ও গ্যাস আয়সহ—বণ্টনের বিষয় ছিল।
হাদরামাউত ও মাহরাহ অঞ্চলের অভ্যন্তরে সামরিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও, সৌদি ও ওমান হাদরামি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উৎসাহ দিচ্ছে—এই আশঙ্কায় এসটিসি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। গত বছরে সৌদি আরব মাহরাহে তাদের নিজস্ব ন্যাশনাল শিল্ড মিলিশিয়া মোতায়েন করেছে।
ইউএই-এর ক্ষেত্রে বড় লক্ষ্যটি আরও স্পষ্ট: ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইরানের মতো বড় শক্তিগুলোকে দুর্বল করা এবং আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে খণ্ডিত করা। তাদের দৃষ্টিতে, এই বিশৃঙ্খলাই দুইটি ‘বিপথগামী’ রাজনৈতিক সত্তার বর্তমান রূপে টিকে থাকা ও পরিবর্তনের চাপ মোকাবিলার সর্বোত্তম উপায়। -অ্যান্ড্রু হ্যামন্ড, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে তুর্কি ইতিহাস পড়ান। তিনি Popular Culture in North Africa and the Middle East এবং The Illusion of Reform in Saudi Arabia বইয়ের লেখক, পাশাপাশি আধুনিক ইসলামী চিন্তাধারা নিয়ে বহু একাডেমিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। এর আগে তিনি ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, বিবিসি আরবি এবং রয়টার্সে মিসর ও সৌদি আরবে কাজ করেছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button