২০২৫ সাল গাজা ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার কী চেহারা উন্মোচন করলো?

২০২৬ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গত বছরের ঘটনাগুলো শুধু স্মরণ নয় বরং গভীর আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। ২০২৫ সাল জুড়ে গাজা কেবল আরেকটি ধ্বংসের অধ্যায় সহ্য করেনি বরং এটি আধুনিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার সবচেয়ে নির্মম আয়নায় পরিণত হয়েছে। ওই বারো মাসে যা ঘটেছে, তা শুধু টানা সহিংসতা নয় বরং একটি গভীর সত্যের উন্মোচন। এটা আইন, নৈতিকতা ও সার্বজনীন মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত বলে দাবি করা একটি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ গাজাকে আর শুধু মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সেই বাস্তবতা তখন প্রশ্নাতীত। বরং যে প্রশ্নটি এখন সামনে আসছে, তা আরও অস্বস্তিকর। আইনি নীতির সঙ্গে কৌশলগত স্বার্থের সংঘর্ষ হলে বৈশ্বিক ক্ষমতা আসলে কীভাবে কাজ করে, গাজা আমাদের সেটাই দেখিয়েছে। উত্তরটি এড়িয়ে যাওয়া ক্রমশ অসম্ভব হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়নি বরং ইতিহাসগতভাবে যেভাবে এটাকে নকশা করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই কাজ করেছে। ২০২৫ সালের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গাজা ও আন্তর্জাতিক আইনের মিথের বিপর্যয়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইনের লাগাতার উল্লেখের পাশাপাশি তার পদ্ধতিগত নিষ্ক্রিয়করণ। আদালত অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়েছে, জাতিসংঘ সংস্থাগুলো জরুরি সতর্কতা জারি করেছে, কূটনৈতিক ভাষা উদ্বেগ ও দুঃখে পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু এর কোনোটিই গাজার ফিলিস্তিনিদের বাস্তব জীবনে কোনো পরিবর্তন আনেনি। আইন দৃশ্যমান ছিল, কিন্তু সুরক্ষা ছিলো অনুপস্থিত।
এই বৈপরীত্য আকস্মিক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক আইন গড়ে উঠেছে সার্বজনীন নীতির সঙ্গে অসম ক্ষমতার এক কাঠামোগত টানাপোড়েনের ওপর। এটি সংযমের প্রতিশ্রুতি দিলেও কখনোই সেই শক্তিগুলোর আধিপত্য থেকে মুক্ত হতে পারেনি, যারা আইন প্রয়োগ করে কিংবা আইন উপেক্ষা করার ক্ষমতা রাখে। ২০২৫ সালের গাজা এই টানাপোড়েনকে সবচেয়ে নগ্নভাবে উন্মোচন করেছে।
আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হয়নি কারণ সেগুলো উপেক্ষিত ছিল। এগুলো ব্যর্থ হয়েছে কারণ সেগুলো কখনোই ভূরাজনীতির জটিলতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। আইন দুর্বলদের ঢাল হিসেবে নয় বরং শক্তিশালীদের জন্য বৈধতার একটি আনুষ্ঠানিক আচার হিসেবে কাজ করেছে। ঢাল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু প্রয়োগ করেনি। প্রক্রিয়া দিয়েছে, কিন্তু পরিণতি আনেনি।
ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি এক নির্মম বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। তারা বিশ্বে সহিংসতার সবচেয়ে বেশি নথিভুক্ত ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছে, অথচ একই সঙ্গে সবচেয়ে কম সুরক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়ে গেছে। তাদের কষ্ট স্বীকৃত হয়েছে, সংরক্ষিত হয়েছে, বৈশ্বিক ফোরামে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু খুব কমই থামানো হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে গাজা দাঁড়িয়ে আছে ‘আইনি বৈধতাপ্রাপ্ত ভুক্তভোগী’র এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। তাদের ওপর কৃত অন্যায় স্বীকৃত, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে স্পর্শাতীত।
পশ্চিমা নৈতিক কর্তৃত্বের ক্ষয়ের সাথে আইনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় ও পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক কর্তৃত্বের পতন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিভিন্ন সংঘাতে পশ্চিমা প্রতিক্রিয়ার বৈষম্য আর সূক্ষ্ম ছিল না, ছিল স্পষ্ট ও প্রকট। যেসব মানদণ্ডকে সার্বজনীন বলে দাবি করা হতো, সেগুলো আবারও শর্তসাপেক্ষ প্রমাণিত হয়েছে। গাজা গ্লোবাল সাউথ জুড়ে পশ্চিমা নৈতিক নেতৃত্বের দাবির প্রতি দীর্ঘদিনের সন্দেহকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। মানবাধিকার ভাষ্য, যা একসময় নৈতিক প্রভাবের উৎস ছিল, নির্বাচনী প্রয়োগের কারণে ক্রমেই তা ফাঁপা বাক্য শোনাতে শুরু করেছে।এটি শুধু সুনামহানির বিষয় নয় বরং এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো হয়তো সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ধরে রাখবে, কিন্তু তাদের বৈশ্বিক নৈতিক দিগন্ত নির্ধারণের ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। গাজা এই পতনের সূচনা করেনি বরং সেটিকে নিশ্চিত করেছে। ২০২৫ সাল মধ্যপ্রাচ্যের ন্যায়বিচারহীন স্থিতিশীলতায় মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও জনসমর্থনের মধ্যকার ব্যবধানকে আরও গভীরভাবে উন্মোচন করেছে। অনেক সরকার উত্তেজনা এড়িয়েছে, কূটনৈতিক সমীকরণ বজায় রেখেছে এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। সংকীর্ণ নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে অঞ্চলটি স্থিতিশীলই মনে হয়েছে। কিন্তু গাজা আরব ও মুসলিম জনগণের কাছে এক শক্তিশালী নৈতিক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে—যখন সরকারি প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক, সংযত বা নীরব।
এই বিচ্ছিন্নতা তাৎক্ষণিকভাবে শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল না করলেও তাদের নৈতিক বয়ানকে ফাঁপা করেছে। স্থিতিশীলতা টিকে ছিল, কিন্তু অর্থ হারিয়েছে। ২০২৫ সালে গাজা কোনো বিপ্লব আনেনি বরং বিচ্ছিন্নতা ও বঞ্চনার অনুভূতিকে তীব্র করেছে। ফলে যে চিত্রটি ফুটে উঠেছে, তা হলো এমন এক কর্তৃত্ববাদী স্থিতিস্থাপকতা, যা সমাজের নৈতিক অনুভূতি থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন।
এই বছর স্বাভাবিকীকরণ নীতির যুক্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সংযম বা প্রভাব তৈরি করবে, এই বিশ্বাস ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। প্রভাব তৈরির বদলে স্বাভাবিকীকরণ আরও দায়মুক্তির সঙ্গে সহাবস্থান করেছে। গাজা ক্ষমতার এক মৌলিক ভুল ব্যাখ্যা উন্মোচন করেছে, যা জবাবদিহিতা ছাড়া সম্পৃক্ততার আচরণ সংযত করে না বরং বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের শৃঙ্খলা অভ্যন্তরীণ সম্মতির চেয়ে বহিরাগত নিশ্চয়তার ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। ২০২৫ সালের গাজা এই মডেলের সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছে। ন্যায়বিচার ছাড়া শৃঙ্খলা টিকে থাকতে পারে, কিন্তু বৈধতা পারে না। মানুষ যখন বারবার নৈতিক ব্যর্থতা দেখে অথচ রাজনৈতিক পরিণতি দেখে না, তখন নীরবতা আর সম্মতি থাকে না, তা হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্নতা।
সামনে তাকালে
২০২৬ সার শুরু হলেও গাজা শারীরিকভাবে বিধ্বস্তই রয়ে গেছে, কিন্তু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য সীমান্ত ছাড়িয়ে বহুগুণে বিস্তৃত হয়েছে। এটি এখন শুধু ফিলিস্তিনিদের কষ্টের প্রতীক নয়, বরং সমসাময়িক শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতার এক বৈশ্বিক মানদণ্ড।
সামনের সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু অন্যায়ের ধারাবাহিকতা নয়, বরং তার স্বাভাবিকীকরণ। যখন কষ্ট পরিচিত হয়ে যায় এবং দায়মুক্তি পূর্বানুমেয় হয়, তখন ক্ষোভ ধীরে ধীরে অবসাদে রূপ নিতে পারে। কিন্তু ২০২৫ সালের এ গভীরতর শিক্ষা আরও অস্বস্তিকর। তা হচ্ছে, বৈধতা একবার হারালে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।
গাজা তথাকথিত নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটায়নি বরং তা দেখিয়েছে। অনেকের জন্য সেটি কখনো অস্তিত্বশীলই ছিল না। সামনে কী হবে, তা নির্ভর করবে এই উন্মোচনকে আমরা সমস্যা হিসেবে দেখব, নাকি ক্ষমতা, আইন ও নৈতিকতার পারস্পরিক সম্পর্ক নতুন করে ভাবার একটি আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করব, তার ওপর।
যদি ২০২৫ সাল স্মরণীয় হয়, তবে তা ন্যায়বিচারের বিজয়ের বছর হিসেবে নয় বরং সেই বছর হিসেবে স্মরণযোগ্য হবে, যখন বিশ্ব জানত চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার মূল্য কতটা। আর তখন যুক্তিসঙ্গতভাবেই সে অজ্ঞতার দাবি করতে পারত না। -একাো এর্নাদা, ইন্দোনেশিয়ার ইউনিভার্সিটাস জেম্বার (ইউএনইজে)–এ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে একজন প্রভাষক। তিনি নাহদলাতুল উলামা ইন্দোনেশিয়ার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সংস্থার বোর্ড সদস্যও।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button