গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা ডিজিটাল নিশ্চিহ্নতায়ও বিস্তৃত হচ্ছে

প্রত্যেক ফিলিস্তিনি ঘরে একটি আলাদা থলি থাকে। কখনো তা আলমারির ওপর, কখনো কোনো গোপন ড্রয়ারে অথবা তালাবদ্ধ ঘরে বিছানার নিচে। এই থলিতে থাকে কাগজপত্র ও ছবি, বাদামি ও সাদা খাম, পাসপোর্ট, একাডেমিক সার্টিফিকেট, উত্তরাধিকার ও বিবাহের কাগজপত্র। এগুলো পরিবারের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সংরক্ষণ করে, একইসঙ্গে ভবিষ্যতের পথও রক্ষা করে। আধুনিক যুগে, এসব নথির অনেকগুলো ডিজিটালি সংরক্ষিত হয়েছে, যাতে দ্রুত পাওয়া ও ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এই পরিবর্তনও থামাতে পারেনি সেগুলোর ধ্বংস ২১শ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে। ইসরায়েলের গাজার ওপর পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক আর্কাইভ, শারীরিক ও ডিজিটাল, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক এবং একাডেমিক ও সামাজিক—সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। কার্যত তাদের আইনগত অস্তিত্বও মুছে ফেলছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের গাজায় যুদ্ধ ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে এবং হাজার হাজার আবাসিক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। গাজার ৮০ শতাংশেরও বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ অন্তত একবার না একবার স্থানচ্যুত হয়েছে। এতে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। হাজারো প্রাণহানির পাশাপাশি ফিলিস্তিনিরা গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ইসরায়েলের হামলা শুধু তাদের শারীরিক অস্তিত্ব নয়, তাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অস্তিত্বের প্রতিটি চিহ্নও মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। বারবার বোমাবর্ষণে পালাতে বাধ্য হওয়ায়, ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো তাদের পারিবারিক ছবি, ব্যক্তিগত কাগজপত্র, আইনগত নথি, ভ্রমণ রেকর্ড, জন্ম ও বিবাহ সনদ হারিয়েছে। ডিজিটাল কপি রাখা কম্পিউটার ও ফোনের স্মৃতিগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। পরিবারের স্মৃতি মুছে যাওয়াটা এখন জীবন মুছে যাওয়ারই এক সম্প্রসারণ—যা শরীর হত্যা থেকে ইতিহাস, পরিচয় ও ধারাবাহিকতা হত্যায় রূপান্তর।
নিশ্চিহ্ন করার অভিযান:
জাতিসংঘ জানাচ্ছে, যুদ্ধ চলাকালীন গাজার কুড়ি লা বেশি মানুষের প্রায় অর্ধেক নিজেদের পরিচয়পত্র হারিয়েছে। অবকাঠামো ধসে পড়ায় এবং সিভিল রেকর্ড ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় হাজারো জন্ম ও মৃত্যু রেজিস্ট্রি অদৃশ্য হয়ে গেছে।
ইসরায়েলের নিশ্চিহ্ন করার অভিযান গভীরভাবে গাজার একাডেমিক ও পেশাগত পরিকাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত। অবরুদ্ধ এই অঞ্চলের সব বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে, বহু অধ্যাপক নিহত হয়েছেন। পাঁচ লাখেরও বেশি শিশুর শিক্ষাজীবন বন্ধ হয়ে গেছে, একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ বা আন্তর্জাতিক সুযোগের জন্য প্রয়োজনীয় একাডেমিক ডেটাও ধ্বংস হয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ডেটাবেস নিশ্চিহ্ন হয়েছে। শারীরিক ও ডিজিটাল ধ্বংস সত্ত্বেও প্রতিটি ফিলিস্তিনির হৃদয়ে একটি গোপন ভাণ্ডার থাকে। থাকে হাজার হাজার গল্প, যা জীবন্ত ও অবিনাশী।
গাজার সাংস্কৃতিক, শিল্প, সাহিত্য ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই—এমন শত শত প্রতিষ্ঠান বর্তমান যুদ্ধের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করা হয়েছে।
এই অভিযানে গাজার আর্কাইভাল ঐতিহ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ মুছে গেছে। ধ্বংস হয়েছে সহস্রাধিক বই এবং নথি, যেগুলোর কিছু উসমানীয় যুগের। এক অমূল্য বৌদ্ধিক ও ঐতিহাসিক সংগ্রহ প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে গাজা সিটির কেন্দ্রীয় আর্কাইভ পুড়ে যায় যেখানে ছিল জমির রেকর্ড, পৌরসভার নথি ও সরকারি প্রাথমিক চিঠিপত্র ।
মিউজিয়ামগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে, যেমন রাফাহ মিউজিয়ামের প্রাচীন মুদ্রা, তামার প্লেট, গয়না—সবই হারিয়ে গেছে। এই সাংস্কৃতিক নিশ্চিহ্নকরণ আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ এবং এটি ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নীতি: ১৯৪৮ সালে ৭০,০০০ ফিলিস্তিনি বই লুট করা থেকে শুরু করে ১৯৮০-এর দশকে লেবাননে পিএলও’র আর্কাইভ দখল করা পর্যন্ত। আর এখনো ধারাবাহিকভাবে তা চলছে।
ডিজিটাল দমন-পীড়নের বিস্তার:
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার ৮০ শতাংশের বেশি সরকারি ভবন ধ্বংস হয়েছে, এর সাথে আর্কাইভ ও ডিজিটাল সার্ভারও। এতে ফিলিস্তিনি প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি পুরোপুরি ধসে পড়ার শঙ্কা আরও জোরদার হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে আইন ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক ন্যায়ের ওপর। পরিবার বা রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ না থাকায়, বহু ফিলিস্তিনি এখন নিজেদের পরিচয়, সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকার, বেতন, বা আইনগত অধিকার প্রমাণ করতে পারছে না। এই ধরনের নিশ্চিহ্নকরণ সময়ের সাথে একটি নতুন শ্রেণি তৈরি করে যারা অদৃশ্য ফিলিস্তিনি, যাদের সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়।
ফলে বৈধ লেনদেনের বদলে সমাজ চলে ক্ষমতার প্রভাব ও সুযোগসন্ধানী আচরণে।
ফিলিস্তিনি আর্কাইভের শারীরিক ধ্বংসের পাশাপাশি চলছে ডিজিটাল অভিযানে দমন—যেখানে টেক কোম্পানিগুলো প্রো-প্যালেস্টাইনি কনটেন্ট সরিয়ে দিচ্ছে, অ্যাকাউন্ট বন্ধ করছে, ছায়া-নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে।
এটি যুদ্ধের নথিপত্রকে প্রতিহত করার সমন্বিত প্রচেষ্টা বলে মনে হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দেখিয়েছে যে, শান্তিপূর্ণ বা নিছক তথ্যভিত্তিক পোস্ট হলেও, কনটেন্ট মুছে দেওয়া, অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করা, ফিচার সীমিত করা ইত্যাদি করা হচ্ছে এবং এগুলো বড় ধরনের ডিজিটাল দমনের অংশ। এই ডিজিটাল নিশ্চিহ্নতা শুধু ফিলিস্তিনিদের নয়, বিশ্বজুড়ে সমর্থক, কর্মী, একাডেমিক, সাংবাদিক সবাইকে টার্গেট করছে। এটি অ্যালগরিদমিক ফিল্টারিং ও এআই-চালিত দমন, যার উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনের দৃশ্যমানতা ও বর্ণনা প্রতিহত করা।
স্মৃতি ধ্বংসের বিরুদ্ধে স্থিতি:
ভূমি, নথি, লাইব্রেরি, আর্কাইভ, জীবন—এসবের ক্ষতি ফিলিস্তিনিদের জন্য নতুন নয়। ১৯৪৮ থেকে আজ পর্যন্ত এটাই বাস্তবতা। নতুন বিষয় হলো, ডিজিটাল নিশ্চিহ্নতা—এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে স্মৃতিকেও আক্রমণ করা হচ্ছে।
তবুও, শারীরিক ও ডিজিটাল নিশ্চিহ্নতার সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, প্রতিটি ফিলিস্তিনি হৃদয়ে বহন করে এক অদৃশ্য ভাণ্ডার: হাজার গল্প—জীবন্ত, অটুট, অক্লান্ত।
কোনো যুদ্ধ, কোনো গণহত্যা এগুলো মুছে দিতে পারে না। আর এই অটলতা ফিলিস্তিনিদের এমন এক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে, যা বর্তমান অন্ধকারের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল। -সুজুদ আওয়াইস, মালয়েশিয়াভিত্তিক একজন ফিলিস্তিনি গবেষক ও একাডেমিক। তিনি গণমাধ্যম এবং ফিলিস্তিনি ও আরব সম্প্রদায়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি সাইন্স মালয়েশিয়া থেকে মিডিয়া ও কমিউনিকেশন বিষয়ে পিএইচডি এবং বীরজেইত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক অধ্যয়নে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তার একাধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি পিয়ার-রিভিউড মিডিয়া স্টাডিতেও অবদান রেখেছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button