জাতিসংঘ কখনোই সমস্যার মূল কারণের কাছে পৌঁছাতে পারে না
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আবারও একটি অ-বাধ্যতামূলক প্রস্তাব পাস করেছে, যা ইসরায়েলের উপনিবেশবাদী সম্প্রসারণকে দখলকৃত ফিলিস্তিনে একটুও থামাতে পারবে না। যে কোনো প্রস্তাব যা দুই-রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলে, তা উপনিবেশবাদকে রক্ষা ও সমর্থন করে। ১৯৬৭ সালে দখল করা অঞ্চলগুলো থেকে ইসরায়েলকে প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও, তা ইসরায়েলের উপনিবেশবাদী অস্তিত্বকে বদলায় না—বিশেষ করে যখন জাতিসংঘের প্রস্তাব ১৯৪ ফিলিস্তিনিদের প্রত্যাবর্তনের অধিকারকে ইসরায়েলের উপনিবেশবাদী শর্তের ওপর নির্ভরশীল করে।
উপনিবেশবাদের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কারণেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবকের মতো নেতাদের বক্তব্য অর্থহীন হয়ে পড়ে, যখন তিনি বলেন যে ফিলিস্তিনিদের ৭৮ বছর ধরে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। “আসুন, আবারও স্মরণ করি যে, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং নিজের দেশে যুদ্ধ, দখলদারিত্ব ও সহিংসতা থেকে মুক্তভাবে শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার মানবাধিকার কোনো অর্জনযোগ্য সুবিধা নয় বরং এটি সুরক্ষিত একটি অধিকার” তিনি বলেন।
১৯৪৭ সালে কিউবা জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল, কারণ এটি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লঙ্ঘন করেছিল। জাতিসংঘে কিউবার প্রতিনিধি ড. এরনেস্টো দিহিগো ঘোষণা করেছিলেন: “আমরা জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছি, কিন্তু যখন তা বাস্তবায়নের সময় আসে, আমরা তা ভুলে যাই—এটি দেখে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।”
বেয়ারবকের উল্লেখিত ৭৮ বছরের সময়রেখা ১৯৪৭ থেকে শুরু, কিন্তু আলোচনাকে শুধু দখলদারিত্ব শেষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে ইসরায়েলের উপনিবেশবাদী অস্তিত্ব বৈধতা পায়। এসব বৈপরীত্য ফিলিস্তিনের মুক্তির পক্ষে কোনো সাহায্য করে না। কারণ সত্যিই বলতে গেলে, জাতিসংঘ ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য নয়—বরং দুই-রাষ্ট্র সমাধান অথবা ফিলিস্তিনের সম্পূর্ণ উপনিবেশায়নের জন্য কাজ করে।
অ-বাধ্যতামূলক একটি প্রস্তাব, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রচলিত বাগাড়ম্বরকে অনুসরণ করে, সেটি ফিলিস্তিনিদের জন্য ক্ষতিকর। যদি সত্যিই দখলদারিত্ব শেষ করার ইচ্ছা থাকতো—যা একদম ন্যূনতম চাহিদা—তাহলে জাতিসংঘ কেন ইসরায়েলের নিরাপত্তার বয়ানকে তার প্রথম অগ্রাধিকার বানায়? যদি বেয়ারবকের উদ্দেশ্য হয় অন্তত ১৯৬৭-পূর্ব সীমান্তে ইসরায়েলের সামরিক দখলদারিত্ব প্রত্যাহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা, তাহলে প্রশ্ন হলো—ইসরায়েলের কোন “নিরাপত্তা বয়ান” তখন রক্ষা করা হবে? জাতিসংঘ কি ১৯৪৮ সালের নাকবা, যার ওপর ইসরায়েলের উপনিবেশিক প্রকল্প নির্মিত, তার বৈধতা বজায় রাখবে? যদি আমরা ১৯৪৭-এ ফিরে যাই, যেটি বেয়ারবক সময়রেখায় উল্লেখ করেছেন, তাহলে জাতিসংঘ কি উপনিবেশমুক্তির দিকে নজর দেবে?
উপনিবেশবাদ আত্মনিয়ন্ত্রণকে অস্বীকার করে। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এর অর্থ হবে উপনিবেশমুক্তি, শুধু ইসরায়েলের সামরিক দখলদারিত্বের অবসান নয়। ফিলিস্তিনের কোনো ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নেই। ১৯৪৭ সালের বিভাজন পরিকল্পনা ইহুদীবাদীদের “অনুর্বর ভূমি”র দাবিকে বৈধতা দেয় এবং উপনিবেশকারীদের জন্য আদিবাসীদের নির্মূল করার পথ সহজ করেছে।
আজও ফিলিস্তিনিরা ঠিকভাবে কথা বলতে পারে না—আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ই ঠিক করে দেয় ফিলিস্তিনিরা কখন, কীভাবে, কতটা দৃশ্যমান হবে। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠস্বর আসলে শোনা যায় না, শোনা যায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে যা বলাতে চায় শুধু তা-ই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তাদের তৈরি হওয়া ভূমিকাই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছে, তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধীনতা, এবং উপনিবেশমুক্তির প্রকৃত দাবি তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এই সমস্ত বিষয় বিবেচনায় নিলে প্রশ্ন ওঠে, একটি অ-বাধ্যতামূলক প্রস্তাব, যা কেবল সাধারণীকৃত বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করে, তা কি সত্যিই ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোনো উপকারে আসে? -রামোনা ওয়াদি একজন স্বাধীন গবেষক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, বই পর্যালোচক ও ব্লগার। তার লেখালেখিতে ফিলিস্তিন, চিলি এবং লাতিন আমেরিকা–সংক্রান্ত নানা বিষয় উঠে আসে।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



