ইউরোপের সামনে অপেক্ষা করছে আরেকটি অন্ধকার বছর

১৪ ডিসেম্বর নিজের দলের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্ৎস যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপ সংক্রান্ত এক অভূতপূর্ব মন্তব্য করেন, যা শিরোনাম হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, “প্রিয় বন্ধুরা, ইউরোপের জন্য। এবং জার্মানির জন্যও ‘প্যাক্স আমেরিকানা’র যুগ প্রায় শেষ। আমরা যেভাবে জানতাম, তা আর বিদ্যমান নেই। নস্টালজিয়া দিয়ে এই বাস্তবতা বদলানো যাবে না। আমেরিকা এখন খুবই নির্মমভাবে নিজেদের স্বার্থ অনুসরণ করছে। এর একটাই জবাব হতে পারে, আমাদেরও এখন নিজেদের স্বার্থ অনুসরণ করতে হবে। আর প্রিয় বন্ধুরা, আমরা দুর্বল নই, আমরা ছোটও নই।”
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন যে ‘প্যাক্স আমেরিকানা’ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইউরোপ ও আমেরিকার সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করেছিলো, তা এখন প্রকাশ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
বাস্তবে, মার্ৎস এমন একটি সীমা অতিক্রম করেছেন, যা শীতল যুদ্ধের পর খুব কম ইউরোপীয় নেতাই কল্পনা করেছেন। এর পেছনে রয়েছে চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির (এনএসএস) ধাক্কা।
এই নথিতে রাশিয়াকে আর হুমকি হিসেবে চিহ্নিতই করা হয়নি। বরং ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টার একটি “উপাদান” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে রাশিয়াকে। মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার পাশাপাশি এই শান্তি প্রতিষ্ঠাকেই এখন ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বার্থ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ক্ষতচিহ্নে যেন লবণ ছিটিয়ে দিয়ে এনএসএস-এ বলা হয়েছে, “নাটো’র অবিরাম সম্প্রসারণের ধারণা ও বাস্তবতা থামতে হবে।” একটি বাক্যেই প্রায় তিন দশকের সেই পশ্চিমা বয়ান নিঃশব্দে বাতিল করে দিল জোটের শীর্ষ শক্তি, যাতে ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ ও ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করা হতো।এ কারণে ইউরোপে এনএসএস-কে উদ্বেগের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো, ইউরোপীয় নেতারা এতে এতটা ‘আশ্চর্য’ হচ্ছেন কেনো? কারণ, এই নথি কেবল লিখিত রূপ দিয়েছে সেই কথাগুলোকে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক দশকেরও বেশি সময় ধরে খোলাখুলিভাবে বলে আসছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতেই ইউরোপীয় অভিজাতরা সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন, যখন ট্রাম্প ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে পাঠিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন।
মার্ৎসের বক্তব্যের সুর মিলেছে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের বার্লিনে দেওয়া প্রলয়ংকরী ভাষণ, ফ্রান্সের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল ফাবিয়েন মানডোঁ এবং ন্যাটো মিলিটারি কমিটির চেয়ার অ্যাডমিরাল জিউসেপ্পে কাভো দ্রাগোনের বক্তব্যের সঙ্গে। এমনকি ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাভো দ্রাগোন রাশিয়ার বিরুদ্ধে আগাম বা প্রতিরোধমূলক “হাইব্রিড আক্রমণ”-এর পক্ষেও মত দেন।
এতসব ভয়ভীতি ছড়ানোর পেছনে একটি উদ্দেশ্য এড়ানো কঠিন। যা হচ্ছে, ইইউ’র সদ্য ঘোষিত ৮০০ বিলিয়ন ইউরো পুনঃসশস্ত্রীকরণ পরিকল্পনার পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করা। এই পরিকল্পনাকে দেখানো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার ফলে তৈরি শূন্যতা পূরণের উপায় হিসেবে, যেখানে রাশিয়ার হুমকিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে।
কৌশলহীন পুনঃসশস্ত্রীকরণ:
এই বয়ান আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন জার্মানিতে চরম ডানপন্থী ‘আলটারনেটিভ ফর জার্মানি’র (এএফডি) উত্থান লক্ষ্য করা যায়—যে দলের সঙ্গে নাৎসিবাদের স্পষ্ট আদর্শিক যোগ রয়েছে। একই সময়ে জার্মানিকে ব্যাপকভাবে পুনরায় সশস্ত্রীকরণের আহ্বানও জানানো হচ্ছে। কিন্তু এই বৈপরীত্য ইউরোপের উদারপন্থী অভিজাতদের চোখে পড়ছে না। তারা এখনো “রুশ স্বৈরতন্ত্রের হুমকি” নিয়েই আচ্ছন্ন।
এর বাস্তব অর্থ কী তা মার্ৎস স্পষ্ট করে দিয়েছেন। জার্মানি যদি দ্রুত সেনাবাহিনী সম্প্রসারণে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা “অনিবার্য” হয়ে উঠতে পারে। একই সুর শোনা যাচ্ছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, পোল্যান্ড এবং নর্ডিক ও বাল্টিক দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকেও।
কিন্তু এই আহ্বানের ভিত্তিটাই প্রশ্নবিদ্ধ। জার্মানি বা ইউরোপের সামনে রাশিয়ার তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকি রয়েছে, এই দাবি ব্যাপকভাবে বিতর্কিত।
প্রায় চার বছরের যুদ্ধে রাশিয়া ইউক্রেনের পুরো ভূখণ্ডই দখল করতে পারেনি। ন্যাটোভুক্ত দেশ আক্রমণ করার মতো সম্পদ ও সক্ষমতাও তার আছে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে, জার্মানি ও আরও অনেক ইউরোপীয় দেশের পক্ষে বড় পরিসরে পুনরায় নিয়োগ বা যুদ্ধ অর্থনীতিতে শিল্প খাত রূপান্তর করাও বাস্তবসম্মত নয়। স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী কমছে এবং পুরোনো হচ্ছে, নিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও ধীরগতির।
জার্মানির শিল্পভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। চীনা প্রতিযোগিতার চাপে পড়েছে অটোমোবাইল খাত। অস্ত্র উৎপাদনে ঝুঁকে শিল্পগত সুবিধা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা বলা যত সহজ বাস্তবায়ন ততটাই কঠিন। ইউরোপের বড় অংশ একই কাঠামোগত সমস্যায় ভুগছে।
এর ফল হলো এক অবাস্তব পরিস্থিতি, যেখানে কূটনীতির বিকল্প হিসেবে সামরিকীকরণকে তুলে ধরা হচ্ছে, যেন রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করবে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা।
কেউ কেউ একে জিইটেনওয়েন্ডি অর্থাৎ ‘এক ঐতিহাসিক মোড়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন, যেখানে ইউরোপ নাকি নিজের নিরাপত্তার “দায়িত্ব” নিচ্ছে। বাস্তবে এটি কেবল আটলান্টিক জোটের ভেতরে দায়ভার স্থানান্তর। কৌশল ঠিক হচ্ছে ওয়াশিংটনে, ঝুঁকি ও পরিণতি বহন করছে ইউরোপ।
ইউরোপের ফাঁপা ক্ষমতা:
মার্ৎস ও তার ইইউ সহকর্মীরা যদি মনে করেন ব্যাপক পুনঃসশস্ত্রীকরণই এই অচলাবস্থা থেকে বেরোনোর পথ, তবে তারা আত্মপ্রবঞ্চনায় ভুগছেন।
২০২২ সাল থেকে ইউরোপীয় নেতারা নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল করেছেন, প্রতিযোগিতামূলক শক্তি হারিয়েছেন, শিল্প সক্ষমতা খালি করেছেন এবং শিল্পহ্রাসকে গুণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এর সবই করেছেন এমন এক যুদ্ধে, যা জেতার সম্ভাবনা তাদের নেই, কারণ কৌশলের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নয়। কারখানা বন্ধ হচ্ছে, জ্বালানির দাম বাড়ছে, সরবরাহ চেইন অন্যত্র সরে যাচ্ছে। তবুও ইইউ নীতিনির্ধারকেরা বাস্তবতা অস্বীকার করে চলেছেন। কোনো সুস্পষ্ট দৃষ্টি নেই, কূটনীতি উধাও, ইউরোপের জন্য নতুন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও আলোচনা নেই।
সবকিছু ছেঁকে দেখা হচ্ছে একটাই ফিল্টারে। তা হচ্ছে, রুশভীতি, যা কৌশলের ছদ্মবেশে হাজির। সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, ইইউ স্বাধীনতা রক্ষার দাবি করলেও দেশে দেশে মতপ্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতা সীমিত করার আইন অনুমোদন করছে। ফ্রান্স বা রোমানিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কি সত্যিই গণতান্ত্রিক ছিল? ভিন্নমত পোষণের জন্য যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ—এটাই কি স্বাধীনতার মানে? সাধারণ বোধ ও বাস্তবতার জায়গায় এখন চলছে সামরিকীকরণ। জনমনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, দুর্বল বয়ান কৌশলগত চিন্তার জায়গা দখল করছে।এই আত্মঘাতী পথ পুনর্বিবেচনার বদলে মার্ৎস, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনসহ ইইউ নেতৃত্ব উল্টো আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
তারা ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থ জোগাতে ইউরোপীয় ব্যাংকে থাকা জব্দকৃত রুশ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টাকরেছিলেন ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক ও রেটিং সংস্থাগুলোর সতর্কতা উপেক্ষা করেই। শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। বরং ইইউ করদাতাদের ওপর নতুন করে ৯০ বিলিয়ন ইউরো ঋণের বোঝা চাপানো হয়েছে। ইতিহাস হয়তো এভাবেই লেখা হবে যে, এই সময়ে ইউরোপের আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বেলজিয়ামের তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ভেভার।
রাশিয়া কেন ইইউ’র ৮০০ বিলিয়ন ইউরো পুনঃসশস্ত্রীকরণ কর্মসূচিকে নিছক প্রতিরক্ষামূলক ভাববে, যখন ইইউ দেশগুলো ইতোমধ্যেই রাশিয়ার চেয়ে চার গুণ বেশি সামরিক ব্যয় করে?
২০২৬ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইউরোপীয় নেতৃত্ব এখনো পথ বদলাতে প্রস্তুত নয়। সামান্য আশার আলো হলো, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। বাস্তব পরিবর্তনের জন্য দুটি নীতি মানতেই হবে।
প্রথমত, নিরাপত্তার অবিভাজ্যতা যা হলো, এক দেশের নিরাপত্তা অন্য দেশের নিরাপত্তার বিনিময়ে নিশ্চিত করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা দ্বন্দ্ব। এটা হলো, এক দেশ সামরিক শক্তি বাড়ালে অন্য দেশ তা হুমকি হিসেবে দেখতেই পারে।
এই নীতিগুলো ইউরোপীয় কৌশলে, বিশেষ করে ইউক্রেন ইস্যুতে অন্তর্ভুক্ত না হলে ২০২৬ সালও ইউরোপের জন্য শান্তির দিক থেকে আরেকটি অন্ধকার বছর হয়ে উঠতে পারে। -মার্কো কার্নেলোস একজন সাবেক ইতালীয় কূটনীতিক। তিনি সোমালিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৫ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে তিনি ইতালির তিনজন প্রধানমন্ত্রীর বৈদেশিক নীতি বিষয়ক দলে কাজ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ইতালীয় সরকারের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার সমন্বয়ক ও সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ইরাকে ইতালির রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button