কোরবানি ও দুই পয়গম্বরের পরীক্ষা

মুফতি যাকারিয়া মাসউদ: চলছে আরবি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী জিলকদ মাস। আর ক’টি দিন পরেই শুরু হবে মুসলমানদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি বহনকারী মাস জিলহজ। যে মাসটি আরবি বছর তথা হিজরি সনের শেষ মাস। আর এই মাসটি যেমনভাবে আশ্চর্যজনক এক স্মৃতি বহন করে আসছে, তেমনিভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আমলের পয়গাম জানিয়ে দিয়েও সহায়তা করছে মুসলিম উম্মাহকে।
এই মাসটির মধ্যে রয়েছে ধনী গরিব সবার জন্য নেকি অর্জনের আমল। ধনী ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে পবিত্র হজব্রত পালনের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবিধা। আবার মধ্যবিত্ত মুসলিমদের জন্য রয়েছে সাধ্যানুযায়ী পশু কোরবানির মাধ্যমে খোদাভীতি অর্জনের সুযোগ। একই সাথে গরিবদের জন্য থাকে রোজাসহ কিছু আমলের মাধ্যমে মহান আল্লাহকে খুশি করার সহজ উপায়।
মহামারী করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে মুসলিম উম্মাহর মনের আকাক্সক্ষা সারা জীবনের অর্জিত সম্পদের একাংশ খরচ করে হজব্রত পালন এ বছর ব্যাহত হচ্ছে। তবে ইতোমধ্যেই দ্বিতীয় আমল তথা কোরবানির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বিশ্ব মুসলিম।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা এটাই যে, আমরা কোরবানি বলতে শুধু বাজার থেকে যে যত বড় পারি, পশু ক্রয় করে নিজের পক্ষ থেকে জবাই করে দেয়াকেই বুঝি। প্রকৃত বিষয় কিন্তু ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা কোরবানি তাঁর বান্দাহর প্রতি কেন ওয়াজিব করেছেন? শুধু গোশত খাওয়া আর আনন্দ করার মধ্যেই কী কোরবানি সীমাবদ্ধ? ব্যাপারটি কিন্তু সেরকম নয়। বরং এর মধ্যে লুকিয়ে আছে নিগূঢ় রহস্য।
আসুন তাহলে সংক্ষিপ্তাকারে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো আলোচনা করা যাক। কোরবানি শব্দটি আরবি। এর অর্থ হলো : এমন বস্তু যার মাধ্যমে কারো নৈকট্য লাভ করা যায়। শরিয়তের পরিভাষায় কোরবানি ওই নির্দিষ্ট বস্তুকে বলা হয়, যাকে নির্দিষ্ট সময়ে একমাত্র আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জবেহ করা হয়। (মাজমাউল আনহার ২/২৯৭)
মহান আল্লাহ তায়ালা কোরবানির ব্যাপারে বলেন, কোরবানির পশুর রক্ত ও গোশত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের মনের তাকওয়া। (সূরা হজ : ৩৭)
আমি বলি কোরবানি হলো আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যম। যা ভালোভাবে বুঝা যায় বিশ্বনবী সা:-এর বাণী থেকে। সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, এটি তোমাদের পিতা ইবরাহিম আ:-এর সুন্নাত।
প্রশ্ন হলো, ইবরাহিম আ:-এর কোরবানি কেমন ছিল? এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন পাকে ইরশাদ করেন, ‘অতপর আমি তাকে এক স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন তার পিতার সাথে কাজ করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহিম আ: বলল : হে বৎস, আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি জবেহ করছি, এখন এ ব্যাপারে তোমার অভিমত কী বলো। তখন সে বলল : হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে এ ব্যাপারে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহিম আ: পুত্র ইসমাইল আ:কে কাত করে শায়িত করল। তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম : হে ইবরাহিম, তুমি তো তোমার স্বপ্নাদেশ সত্যই পূরণ করেছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটি ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা।
আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান কোরবানির মাধ্যমে। আমি এটি পরবর্তীদের জন্য স্মরণে রেখেছি। ইবরাহিম আ:-এর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। (সূরা আসসাফফাত ১০১-১০৯ আয়াত)
তাফসিরে ইবনে কাসির, তাফসিরে কাবির ও তাফসিরে মাজহারিসহ অন্যান্য তাফসির গ্রন্থে স্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ইবরাহিম আ:-এর স্ত্রী সারা আ: যখন নিজেকে বন্ধাই মনে করলেন, তখন মিসরের সম্রাটের কাছ থেকে হাদিয়াপ্রাপ্ত তদীয় কন্যা হাজেরাকে ইবরাহিম আ:-এর জন্য উপহার দিলেন। ইবরাহিম আ: হাজেরাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেন। তখন আল্লাহ তায়ালা সেই স্থির বুদ্ধির পুত্রের সুসংবাদ দিলেন। আর সেই পুত্র হলেন ইসমাইল আ:।
আল্লাহ কতক্ষণ পিতা-পুত্রের পরীক্ষা নিলেন? আল্লাহ নিজেই বলেন, যখন ইসমাইল আ:-কে কাত করে শায়িত করলেন ততক্ষণ পর্যন্ত।
ইসমাইল আ: বললেন হে আমার পিতা! আপনি আপনার জামাগুলো বেঁধে নিন আর আমাকে উপুড় করে শায়িত করুন, যাতে আপনার কাপড়ে রক্ত না লাগে খেয়াল রাখুন। আর জামাগুলো মায়ের কাছে নিয়ে যাবেন এতে তাঁর কিছুটা কষ্ট লাঘব হবে। তবে রক্ত দেখলে তাঁর সংবরণ করতে কষ্ট হবে। আমার চেহারা দেখলে আপনার মায়া লাগবে আমিও আপনার চেহারা দেখলে কষ্ট পাবো তাই আপনার চক্ষু বেঁধে নিন।
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরে যখন ছুরি চালালেন তখন আল্লাহ তায়ালা ছুরি আর গলার মাঝে একটা পিতলের টুকরো প্রতিবন্ধক হিসেবে সেট করে দিলেন। যার ফলে কোনো প্রচেষ্টাই গলা কাটতে সক্ষম হলো না।
এ সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ এলো হে ইবরাহিম! তুমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। আল্লাহ তায়ালা জান্নাত থেকে দুম্বা পাঠিয়ে ফেদিয়া হিসেবে কোরবানি করালেন।
এবার এক মিনিট চোখ বন্ধ করে চিন্তা করে বলুন তো : আমাদের কোরবানির অবস্থা কী? আল্লাহ তায়ালা এই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে স্বাবলম্বীদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করেছেন। সেই দুই পয়গম্বর আ:-এর ওপর যে পরীক্ষা হয়েছিল তা স্মরণে রেখে কোরবানি করতে হবে।
শুধু জিলহজ মাসের দশ তারিখে পশু জবাই করে দিলেই কোরবানি হয় না। পূর্র্ণাঙ্গ আনুগত্য সহকারে আল্লাহর সমীপে পশু উৎসর্গ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশা করতে হবে। তবেই ইতিহাস স্মরণ ও আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার ভরসা করা যেতে পারে।
মহান আল্লাহ তায়ালা কোরবানির সব বিধিনিষেধ মেনে পূর্ণাঙ্গ তাকওয়াসহকারে পশু কোরবানি করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : প্রধান মুফতি, কাশফুল উলুম নেছারিয়া মাদরাসা কমপ্লেক্স , নেছারীবাদ, সিংড়া, নাটোর

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...

Close
Back to top button
Close