‘যে কারণে ব্রিটেনের মুসলিম নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ডকুমেন্টারি করলাম’

documentaryবার্মিংহামে প্রায় এক বছর অতিবাহিত করার পর আমি ‘মাই উইক এজ এ মুসলিম’ ডকুমেন্টারি নির্মাণের ধারণা পাই। বার্মিংহাম সেন্ট্রাল মসজিদ ও তার চারপাশের মুসলিমদের নিয়ে চ্যানেল-৪ এর ‘এক্সট্রেমলি ব্রিটিশ মুসলিম’ নামে একটি ধারাবাহিক ফিল্ম আমাকে এটি নির্মাণ করতে উৎসাহ যোগায়।
এটি  তৈরির শেষ সময়ে সেখানে ব্রেক্সিট ভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় একই সময়ে বার্মিংহামের একটি মসজিদের বাইরে ‘ইংলিশ ডিফেন্স লীগের’ একটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় এবং মুসলমানদের উপর হামলার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। আমরা কেবল একটি ছোট অংশকে রক্ষা করতে পেরেছিলাম, কিন্তু আসন্ন সপ্তাহগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই ঘৃণা অপরাধের খবর বের হতো। বাস্তবে যা ঘটছে তার কঠোর বাস্তবতা ব্যাপক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে আমি একটি নতুন ডকুমেন্টারিও তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। আমরা সাহসী কিছু একটা করতে চেয়েছি এবং লক্ষ্য অর্জনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে চেয়েছি।
যখন ডকুমেন্টারি তৈরি করা হয়, তখন প্রায়ই আপনি অনুভব করেন আপনি ধর্মান্তরিত করতে প্রচার করছেন। আমি এমন কিছু করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম- যা এমন লোকদের কাছে পৌঁছাবে যারা সাধারণত মুসলমানদের সম্পর্কে কোন প্রোগ্রামে দেখতে পাবে না।
যখন আমরা এটি তৈরি করতে গবেষণা পর্যায়ে ছিলাম এবং এতে অংশগ্রহণের জন্য লোক খুঁজছিলাম, তখন আমি কিছু শ্বেতাঙ্গ ব্রিটানদের কাছ থেকে এমন কিছু মন্তব্য শুনেছি যা নিয়ে আমি সত্যি সত্যি আতঙ্কিত ছিলাম। ব্রেক্সিট গণভোটের ফলাফল এসব শ্বেতাঙ্গদের অনুপ্রাণিত করে। তারা প্রকাশ্যেই মুসলমানদের প্রতি বৈরিতা প্রকাশ করে। তারা এমন কিছু কথা বলেছিল যা আমি কখনোই ভাবিনি এবং আমি তা আবার শুনতে চাই না।
আমাদের প্রধান অবদানকারী ছিলেন কেটি ফ্রিম্যান। একজন মুসলিম হিসাবে নিজেকে ফুঁটিয়ে তুলতে তিনি মেকআপ এবং তার জামাকাপড়ে পরিবর্তন আনেন। তার মতো আমরা যাদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম তাদের অনেকেই একটি ডানপন্থী সংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না। পরিবর্তে তারা ছিল সাধারণ মানুষ এবং মুসলমানদের সম্পর্কে খুব সামান্য বা কোনো ধারণাই ছিল না। সংবাদপত্র এবং টিভি রিপোর্ট থেকে তারা কেবল মুসলমানদের সম্পর্কে জানত। তাদের অনেকেই মুসলমানদের নিয়ে ভয়ে ছিল এবং দৃঢ়ভাবে অনুভব করত যে তাদের জীবনধারা হুমকির মধ্যে ছিল। আমরা যখন আলভি’র পরিবারের সন্ধান পাই, তখন আমরা সরাসরি বুঝতে পারি যে আমরা এই প্রোগ্রামের জন্য সঠিক মুসলিম পরিবার খুঁজে পেয়েছি। সায়মা আলভি একজন দৃঢ়, স্বাধীন নারী।
তার অনেক প্রশ্ন ছিল-যা আমাদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে আমরা প্রোগ্রামের সীমানায় তার উত্তর খুঁজেছি। আমাদের কাজগুলোর মধ্যে প্রথম কাজ হিসেবে স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় ব্রিটিশ মুসলিম হেরিটেজ সেন্টারের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমরা সাক্ষাৎ করি। স্থানীয় এই কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গে সায়মা ব্যাপকভাবে জড়িত রয়েছে।
আমরা যা করতে চেয়েছি; তা নিয়ে তারা খুশি কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমরা তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। তারা তাৎক্ষণিক আমাদের উদ্দেশ্য বুঝতে পারে এবং আমাদেরকে তারা পূর্ণ সমর্থন দেন।
যখন আমরা কেটির সঙ্গে সাক্ষাত করতাম, তখন তিনি মুসলমানদের সম্পর্কে খুব দৃঢ় মত পোষণ করতেন। যেমন- তিনি বাসে মুসলিমদের পাশে বসতে চান না; নেকাব পরিহিত নারীদের ভয়ে তিনি ভীত ছিলেন। তবে, তিনি মুসলিম সম্প্রদায়কে বোঝার চেষ্টা করতে চেয়েছিলেন এবং তার পূর্বকল্পিত ধারণাগুলো চ্যালেঞ্জ করার একটি বাস্তব ইচ্ছা ছিল। আমরা আশা করছি যেসব লোক কেটি’র মতো দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে- এটি তাদের ভুল ধারণা ভেঙ্গে দিবে। আমি মনে করি ছদ্মবেশ উপাদান এই ডকুমেন্টারির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
‘ব্ল্যাকফেস’ বা ‘ব্রাউনফেস’ ঐতিহাসিকভাবে অশ্বেতাঙ্গ মানুষদের উপহাসের জন্য একটি বিনোদনমূলক ফর্ম হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ডকুমেন্টারি সরাসরি এর বৈপরীত্য। এর উদ্দেশ্য সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বোঝাপড়া এবং তাদের জ্ঞাত করা, তাদের ব্যঙ্গচিত্র করা নয়। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ম্যানচেস্টার বোমা হামলার পর থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য অপরাধ ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
ডকুমেন্টারিতে কৃত্রিম নাক, দাঁত এবং কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারের কারণ অত্যন্ত সহজ আর তা হচ্ছে কেটি’র চেহারা এবং বিভিন্ন অনুভূতি তৈরি করা; যাতে সে তার স্বদেশকে চিনতে না পারে, একজন মুসলিম নারীর মতো দৃঢ়ভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে এবং যাতে এটি তার হোস্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে তাকে সংহত করে।
অনেকেই পরামর্শ দিয়েছে যে আমরা একটি ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারতাম। যেমন-মুসলিম নারীদের অভিজ্ঞতা দেখানোর গোপন ক্যামেরার ব্যবহার। এটি আগেই করা হয়েছে এবং আমরা ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করেছি।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button