কওমি মাদরাসা ও সরকার : কে কার প্রতিপক্ষ

রেজাউল করিম
গত ৫ আগস্ট দেশের শিক্ষাবিদ ও সমাজের সর্বস্তরের জনগণের মতামত ও পরামর্শ চেয়ে শিক্ষা আইন ২০১৩-এর খসড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষা আইন ২০১৩ (খসড়া) প্রণয়ন করা হয়েছে সেই শিক্ষানীতিকে বাস্তবায়ন করার জন্যই। একই দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর সুপারিশের আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক শিক্ষা আইন, ২০১৩-এর খসড়া প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হলো’। শিক্ষা আইন ২০১৩ (খসড়া)-এর প্রস্তাবেও বলা হয়েছে ‘যেহেতু জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি শিক্ষা আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন; সেহেতু এত মাধ্যমে নি¤œরূপ আইন করা হলো।’ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ ও প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন ২০১৩ (খসড়া)-তে সরাসরি মাদরাসা শিক্ষা বন্ধ করার কথা বলা হয়নি। এর পরিবর্তে বিশেষ কৌশলের মাধ্যমে তিনটি উপায়ে মাদরাসা শিক্ষা তথা কুরআন-হাদিস শিক্ষার অস্তিত্বকে সঙ্কটাপন্ন করে ফেলা হয়েছে। পদ্ধতি তিনটি হলো : ১. কওমি মাদরাসাগুলোকে অস্তিত্বের সঙ্কটে ফেলা; ২. কুরআন হিফজের পথ বন্ধ করে দেয়া এবং ৩. মাদরাসা শিক্ষার তাৎপর্য ও চেতনাকে বিকৃত করা। ১. কওমি মাদরাসাগুলোকে অস্তিত্বের সঙ্কটে ফেলা : শিক্ষা আইন ২০১৩-এর খসড়ার সংজ্ঞা অংশে ২(ঘ) উপধারায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞায় বলা হয়েছেÑ “ ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান’ বলিতে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ও স্বীকৃত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বুঝাইবে।” এ উপধারা অনুযায়ী কেবল সরকার অনুমোদিত ও স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমানে কওমি মাদরাসাগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরকার অনুমোদিত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নয়। এ ছাড়া কওমি মাদরাসাগুলোকে অনুমোদন অথবা স্বীকৃতি দেয়ার মতো সরকার-অনুমোদিত কর্তৃপক্ষও নেই। ফলে কওমি মাদরাসাগুলো অনুমোদিত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হবে না। ওই আইনের ১০ (১) উপধারায় প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও এবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন সম্পর্কে বলা হয়েছেÑ ‘এই আইনের অধীনে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম ও এবতেদায়ি মাদরাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের নিকট বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করিতে হইবে। নিবন্ধন ব্যতীত অনুরূপ কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনা করা যাইবে না।’ ওই আইনের ২৩ (১) উপধারায় মাধ্যমিকপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও স্বীকৃতি সম্পর্কে বলা হয়েছেÑ ‘এই আইনের অধীনে মাধ্যমিক স্তরে সাধারণ, মাদরাসা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও ইংরেজিমাধ্যম বা বিদেশী কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশী কোন শাখাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের নিকট বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করিতে হইবে এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি বা স্বীকৃতি গ্রহণ করিতে হইবে। নিবন্ধন ব্যতীত কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনা করা যাইবে না। ওই আইনের ৪১ (১) উপধারায় উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, নিবন্ধন, স্বীকৃত গ্রহণ ও পরিচালনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছেÑ ‘এই আইনের অধীনে উচ্চশিক্ষার (ইংরেজি মাধ্যমসহ) সকল স্তরের প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের নিকট বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করিতে হইবে এবং পাঠ্যদানের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি বা স্বীকৃত গ্রহণ করিতে হইবে। নিবন্ধন ও পাঠ্যদানের অনুমতি ব্যতীত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাইবে না।’ ১০(১), ২৩(১) ও ৪১(১) উপধারায় দুটো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। (ক) নিবন্ধন ও স্বীকৃতি ব্যতীত কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনা করা যাবে না এবং (খ) নির্ধারিত ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে অনুমোদন নিতে হবে। ওই আইনের সংজ্ঞা অংশে ২(ঙ) উপধারায় কর্তৃপক্ষের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছেÑ ‘কর্তৃপক্ষ’ বলিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, যথা : প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর, মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং সরকার বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে বুঝাইবে। এ সংজ্ঞায় বর্তমান বিদ্যমান ৯টি প্রতিষ্ঠানকে কর্র্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে যথা : ১. প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর, ২. মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর, ৩. বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, ৪. মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর, ৫. কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর, ৬. বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, ৭. মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ৮. বিশ্ববিদ্যালয়, ৯. বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। এ সংজ্ঞার শেষাংশে সরকারকে অধিকার দেয়া হয়েছে, সরকার যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে অনুমোদন দেয়ার অধিকার অর্পণ করতে পারবে। বর্তমানে ওপরের ৯টি প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই কওমি মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। ২ ও ৩ নম্বর কর্তৃপক্ষ মূলত আলিয়া মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং কওমি মাদরাসাগুলোকে স্বীকৃতি ও অনুমোদন দেয়ার কোনো প্রতিষ্ঠান বর্তমানে নেই। ফলে কওমি মাদরাসাগুলো কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় অনুমোদন চাইলেও অনুমোদন নিতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে একমাত্র বিকল্প হলো সরকারকে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা অর্পণ করা। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার একমাত্র উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক)। সুতরাং বেফাকের স্বকীয়তা, স্বাধীনতা অুণœ রেখে বেফাককে অনুমোদনদাতা ‘কর্তৃপক্ষ’ ঘোষণা করা ছাড়া কওমি মাদরাসার অস্তিত্ব রক্ষা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, ৬৪ (১) ধারা অনুযায়ী এ আইনের কোনো ধারার লঙ্ঘন দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। ৬৪ (১) উপধারায় বলা হয়েছেÑ ‘এই আইনের কোন বিধানাবলির পরিপন্থী কোন কার্যক্রম সংঘটিত হইলে তফসিল ১-এ বর্ণিত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হইবে’। তফসিল ১-এর গ ও ঘ ক্রমিকে ১০(১) ও ২৩(১) লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে বলা হয়েছেÑ ‘প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ ইহার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ তিন লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা ০৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’ তফসিল ১-এর ক্রমিক চ অনুযায়ী ৪১(১) লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে বলা হয়েছেÑ ‘প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ ইহার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা ১ (এক) বছর কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’ সুতরাং শিক্ষা আইন ২০১৩ বাস্তবায়ন হলে কওমি মাদরাসা নিঃসন্দেহে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়বে। ২. কুরআন হিফজের পথ বন্ধ করে দেয়া : শিক্ষা আইন ২০১৩ খসড়ার সংজ্ঞা অংশের ২(চ) অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপ্তি হলো চার বছর হতে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত। ২(ছ) অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপ্তি প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। এবং ২(জ) অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যাপ্তি নবম শ্রেণি হতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীকে ব্যয় করতে হবে ২+৮ = ১০ বছর। চার বছর বয়স হতে প্রাক-প্রাথমিক স্তর শুরু হলে প্রাথমিক স্তর শেষ করতে একজন শিক্ষার্থীর বয়স দাঁড়াবে ৪+১০ = ১৪ বছর। উল্লেখ্য, পবিত্র কুরআন হিফজ করার উপযুক্ত বয়স ৭-৮ থেকে ১২-১৪ বছর পর্যন্ত। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলে ৪-১৪ বয়সী শিশু-কিশোরদের প্রাক-প্রাথমিক অথবা প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর অর্থাৎ ১৪ বছর বয়সের পর কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষে পবিত্র কুরআন হিফজ করা সম্ভব হয়ে উঠবে না। আরো উল্লেখ্য, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে লেখাপড়ার পাশাপাশি কুরআন হিফজ করাও সম্ভব হবে না। কেননা প্রস্তাবিত আইনের খসড়ার ৭(১) ও ৭(৩) উপধারা অনুযায়ী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক অভিন্ন পাঠ্যসূচি, পাঠ্যক্রম, পাঠ্যপুস্তক ও পরীক্ষা অনুসরণ করতে হবে। ৭(৪) উপধারায় বলা হয়েছে : ‘প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার সকল ধারা (সাধারণ, মাদরাসা ও কিন্ডারগার্টেন) নির্বিশেষে নির্দিষ্ট শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে বাংলা, ইংরেজি, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, বাংলাদেশ স্ট্যাডিজ, গণিত, পরিবেশ পরিচিতি, তথ্য প্রযুক্ত এবং বিজ্ঞান বাধ্যতামূলক হইবে।’ ওই উপধারা অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের ৬-১৪ বছরের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে এই আটটি অভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন করতে হবে। এই আটটি বিষয় অধ্যয়নের পাশাপাশি কুরআন হিফজ করা সম্ভব নয়। ৩. মাদরাসা শিক্ষার তাৎপর্য ও চেতনাকে বিকৃত করা : ওই খসড়া আইনের ৭(১) উপধারায় বলা হয়েছেÑ ‘সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা এবং একই পদ্ধতির মৌলিক শিক্ষার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক এবং এবতেদায়ি শিক্ষার জন্য সকল শিক্ষা ধারায় নির্ধারিত বিষয়সমূহের অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হইবে।… ৭(৪) উপধারায় বলা হয়েছেÑ ‘প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার ধারা (সাধারণ, মাদরাসা ও কিন্ডারগার্টেন) নির্বিবেষে নির্দিষ্ট শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে বাংলা, ইংরেজি, ধর্র্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, বাংলাদেশ স্টাডিজ, গণিত, পরিবেশ পরিচিতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বাধ্যতামূলক হইবে।’ ২১(১) উপধারায় বলা হয়েছেÑ ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার তিনটি ধারা, যথাÑ সাধারণ, মাদরাসা ও কারিগরি ধারাসমূহে সমতার ভিত্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে মৌলিক বিষয়সমূহ যথা : বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ স্টাডিজ, সাধারণ গণিত ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি বাধ্যতামূলক করা হইবে এবং এই সকল বিষয়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।’ ৭(৪) উপধারা অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরে মোট আটটি অভিন্ন বাধ্যতামূলক বিষয় পড়তে হবে এবং ২১(১) অনুযায়ী মাধ্যমিক স্তরে ৫টি অভিন্ন বাধ্যতামূলক বিষয় অধ্যয়ন করতে হবে। প্রকৃত ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উপযুক্ত আলেমে দ্বীন হিসেবে গড়ে ওঠা পরিশ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ বিষয়। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ২+৮+৪ = ১৪ বছর এত বিষয় অধ্যয়নের পাশাপাশি আরবি ভাষা ও সাহিত্য, কুরআন, হাদিস, ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ, আকাঈদ, তাফসির ইত্যাদি বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। আরো উল্লেখ্য, শিক্ষা আইন ২০১৩ খসড়ার ৭(৩) উপধারা অনুযায়ী ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করিবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমতি ব্যতীত উক্ত শিক্ষাক্রমে অতিরিক্ত হিসাবে কোন বিষয় বা পুস্তক অন্তর্ভুক্ত করা যাইবে না।’ শিক্ষা আইন ২০১৩ খসড়ার ২১(৫) উপধারা অনুযায়ী ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করিবে। উক্ত বোর্ডের অনুমতি ব্যতীত শিক্ষাক্রমে অতিরিক্ত হিসাবে কোন বিষয় বা পুস্তক অন্তর্ভুক্ত করা যাইবে না।’ ওপরের ৭(৩) ও ২১(৫) উপধারা অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। বর্তমান অবস্থায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কওমি মাদরাসা শিক্ষার উপযুক্ত পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি তৈরি করতে সক্ষম হবে না। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে এই দায়িত্ব দেয়া হলে কওমি মাদরাসা শিক্ষার স্বকীয়তা, তাৎপর্য ও মৌলিক চেতনা মারাত্মকভাবে বিকৃত হবে। অধিকন্তু ৭(৩) ও ২১(৫) উপধারা অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অতিরিক্ত কোন বিষয় অথবা পুস্তক অন্তর্ভুক্তির জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমতি প্রয়োজন হবে। এটি নিঃসন্দেহে কওমি মাদরাসা শিক্ষাকে সঙ্কুচিত করে ফেলবে। উল্লেখ্য, শিক্ষা আইন ১০১৩ (খসড়া)-এর একটিমাত্র ধারা ২২(৬)(খ)-তে কওমি মাদরাসা শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। এ ধারাটি নি¤œরূপÑ ‘কওমি মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও কওমি মাদরাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করিবার লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে।’ সেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো কী কী ও কখন কিভাবে এসব পদক্ষেপ নেয়া হবে এসব বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। বিশেষ অনিবন্ধিত এসব কওমি মাদরাসার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি কী হবে এ বিষয়ে এ আইনে সুস্পষ্টভাবে ইতিবাচক কিছুই বলা হয়নি। ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কওমি মাদরাসার প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা এবং এ শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এ দেশের আলেম ওলামা ও সাধারণ মুসলমান উদ্বিগ্ন না হয়ে পারেন না। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সরকারের কাছে দু’টি দাবি পেশ করছি : ১. কওমি মাদরাসাগুলোকে এ আইনের আওতার বাইরে রাখা হোক। ২. স্বকীয়তা, স্বতন্ত্রতা ও নিজস্বতা অুণœ রেখে কওমি মাদরাসা শিক্ষা নির্বিঘœ রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হোক।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button