মক্কা চুক্তি: আমেরিকান সন্দেহ থেকে জন্ম নেওয়া নতুন সুন্নি নিরাপত্তা কাঠামো

শুক্রবার জুমার নামাজের দিনে, ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র শহরে তিনজন মানুষ একসাথে দাঁড়িয়ে এমন একটি নথিতে স্বাক্ষর করেন, যা এটি তৈরি করা যুদ্ধের চেয়েও বেশি দিন টিকে থাকতে পারে।
সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট আল-সাফা প্রাসাদে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এর মূল ধারাটি একটি মাত্র বাক্য: “তিনটি রাষ্ট্রের যেকোনো একটির উপর সশস্ত্র আক্রমণকে তাদের সকলের উপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।”
কূটনৈতিক আড়ম্বর সরিয়ে দিন — শরীফ এবং তার শক্তিশালী সেনাপ্রধান, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আগের রাতে যে ওমরাহ পালন করেছিলেন, আর এরদোয়ানের জেদ্দায় একদিনের দৌড়। এসবই এমন একটি স্থানে সতর্কতার সাথে আয়োজন করা হয়, যা ইসলামি বিশ্বের কেন্দ্র ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে দেখা যাবে না। আর যা থাকবে তা হলো মধ্যপ্রাচ্য শেষবার এই পরীক্ষা করে ব্যর্থ হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো রিয়াদ, আঙ্কারা এবং ইসলামাবাদকে এক ছাদের নিচে বাঁধা প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মিলিত প্রতিরক্ষা চুক্তি করালো।
১৯৫৫ সালের একটি ভূত:
আগের প্রচেষ্টাটি ছিল বাগদাদ চুক্তি, ১৯৫৫ সালে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা স্নায়ুযুদ্ধের জোট। এর উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত প্রভাব থেকে মধ্যপ্রাচ্যকে রক্ষা করা। এতে পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকতায় একই খেলোয়াড়রা ছিল — তুরস্ক, ইরাক, ইরান, পাকিস্তান। এটি কয়েক বছরের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। আরব জাতীয়তাবাদ, ১৯৫৮ সালের অভ্যুত্থান যা ইরাকি রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে, এবং মৌলিক সমস্যা, ওয়াশিংটন এবং লন্ডনে তৈরি করা একটি জোট, যার স্বার্থ কখনোই অঞ্চলের নিজস্ব ছিল না,এগুলোই এর পতনের কারণ। মক্কা চুক্তি তার ঠিক বিপরীত।
এটি ফগি বটমে খসড়া করা হয়নি। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, এটি প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা করা হয়েছে, মূলত আমেরিকানদের সম্পৃক্ততা ছাড়াই। এই অনুপস্থিতিই হলো আসল গল্প।
এটি প্রথমবারের মতো মুসলিম বিশ্বের তিনটি বৃহত্তম সামরিক শক্তিকে একটি প্রতিরক্ষা সূত্রের অধীনে একত্রিত করলো, বাগদাদ চুক্তির যুগের পর। এবার একজন বিদেশি পৃষ্ঠপোষক নয়, উপসাগরের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজতন্ত্রই কলম ধরেছে।
প্রত্যেক পক্ষ কী নিয়ে আসছে:
এখানে পরিপূরকতা বাস্তব, সাজানো নয়। তুরস্ক সরবরাহ করছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থায়ী সেনাবাহিনী এবং একটি প্রতিরক্ষা-শিল্প ভিত্তি, বায়রাক্তার ড্রোন, নৌ প্ল্যাটফর্ম — যা লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইউক্রেনে পরীক্ষিত।
পাকিস্তান সরবরাহ করছে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রাগার, প্রায় ১৭০টি ওয়ারহেড, যুদ্ধ-পরীক্ষিত সামরিক বাহিনী এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় বিস্তৃত একটি গোয়েন্দা সংস্থা।
সৌদি আরব সরবরাহ করছে আর্থিক গভীরতা, মক্কা ও মদিনার তত্ত্বাবধান এবং অন্য দুইজনকে একই ঘরে আনার সমন্বয় ক্ষমতা।
শীর্ষ সম্মেলনে ফিল্ড মার্শাল মুনিরের উপস্থিতি নিজেই একটি সংকেত ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক বাহিনী তাদের শীর্ষ সৈনিককে একটি কাগজে স্বাক্ষর দেখার জন্য পাঠায় না।
যে বিষয়টি কেউ উল্লেখ করতে চায় না:
রিয়াদ ব্যাখ্যা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। সৌদি জনকূটনীতির উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি এক্স-এ পোস্ট করেছেন যে, এই চুক্তি “একটি সামরিক জোট বা সাম্প্রদায়িক ব্লক প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নয়” এবং জোর দিয়ে বলেছেন এটি কোনো পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে যুক্ত নয় বা অঞ্চলের কোনো দেশকে লক্ষ্য করেও নয়।
তুর্কি কর্মকর্তারাও একই কথা প্রতিধ্বনি করেছেন: সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক, নতুন সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত, ন্যাটো বা বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতির কোনো বিলোপ এতে নেই। আসলে এই দীর্ঘ অস্বীকৃতি প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্তর্নিহিত হুমকিকেই প্রকাশ করে।
হরমুজ প্রণালীতে তেল পরিবহন বন্ধ করে দেওয়া একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে তুর্কি এবং সৌদি শক্তির সাথে একত্রিত করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। মক্কা চুক্তির সবচেয়ে সরল ব্যাখ্যা হলো এটি ইরান, বা ইসরায়েল, বা নাম করে কাউকে লক্ষ্য করছে না।
এটি হলো রিয়াদ আর একক আমেরিকান ছাতার উপর নির্ভর করতে চায় না, যা উপসাগরের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় বিজ্ঞাপনের চেয়ে ধীর এবং কম নিশ্চিত প্রমাণিত হয়েছে।
তেহরানের জবাব:
ইরান সরকার এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া দেয়নি, কিন্তু অনানুষ্ঠানিক জবাব কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসেছে। ইরানি সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজাই এক্স-এ পোস্ট করেছেন যে, রিয়াদের বোঝা উচিত, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সাথে একটি কাগজের চুক্তি তাদের সেই নিরাপত্তা দেবে না, যা ওয়াশিংটনের উপর দশকের পর দশক নির্ভরতাও দিতে পারেনি।
সৌদিদের “অন্যদের কাছে নিরাপত্তা ভিক্ষা করার” চেয়ে তাদের নিজস্ব নীতি সংস্কার করাই ভালো হবে।  এটি একটি কটাক্ষপূর্ণ কথা, কিন্তু ভুল কথা নয়।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মনসুর আহমেদের মতে, পাকিস্তানের পারমাণবিক অবস্থান এখনো সেই হুমকির দিকে ভিত্তি করে আছে যার বিরুদ্ধে ইসলামাবাদ আসলে পরিকল্পনা করে, আর সেটা হচ্ছে ভারত, পারস্য উপসাগরের উপর পারমাণবিক ছাতা বিস্তার করার দিকে নয়।
মক্কা চুক্তির ইরানের বিরুদ্ধে যেটুকু প্রতিরোধমূলক মূল্য আছে তা মনস্তাত্ত্বিক, কারিগরি নয়। এটি তেহরানের হিসাবের খরচ বাড়ায়, কিন্তু গ্যারান্টি দেয় না যে পাকিস্তানি ক্ষেপণাস্ত্র কখনো সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় উড়বে।
ইসরায়েলের নীরব সমস্যা:
ইসরায়েলের কাঠামোগত সমস্যাটি স্পষ্ট: তিন স্বাক্ষরকারীর মধ্যে কেবল তুরস্কই ইসরায়েলকে স্বীকার করে। অবশ্য গাজা ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি অভিযান এবং এক্ষেত্রে আঙ্কারার বিরোধী আঞ্চলিক অবস্থান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা যা ভবিষ্যতে কোনো পরিস্থিতিতে তুর্কি, সৌদি এবং পাকিস্তানি সামরিক পরিকল্পনাকে একই ঘরে বসাতে পারে, তা ইসরায়েলের হিসাবকে জটিল করে তুলেছে। কারণ প্রতিবেশী এলাকায় একতরফাভাবে কাজ করার আগে তাকে এখন একটি বৃহত্তর প্রতিক্রিয়ার কথাও ভাবতে হবে।
ওয়াশিংটন, পাশ থেকে দেখছে:
আমেরিকার প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত মৃদু এবং এটাই আসল কথা। কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি এই ত্রিপাক্ষিক চুক্তির আগে হওয়া সৌদি-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বৃহত্তর গতিপথটিকে স্পষ্ট করে এভাবে তুলে ধরেছেন: “দোহা হামলা মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার প্রতি আস্থার সংকট প্রকাশ করেছে। উপসাগরীয় রাজধানীগুলো এখন একই সাথে একাধিক দিকে ঝুঁকছে, যার মধ্যে বেইজিংও রয়েছে”।
পশ্চিমা বিশ্লেষকরা চুক্তিটিকে সহানুভূতির সাথে দেখছেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক বোঝা-ভাগাভাগির লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে, যেখানে স্থানীয় শক্তিগুলো ওয়াশিংটন যে প্রতিরোধের দায়িত্ব ছাড়তে চায় তা গ্রহণ করবে।
দুটোই সত্য হতে পারে। আমেরিকান নির্ভরযোগ্যতার প্রতি সন্দেহ থেকে জন্ম নেওয়া একটি চুক্তি একই সাথে, সুবিধাজনকভাবে, কম করার মার্কিন স্বার্থও পূরণ করতে পারে। ওয়াশিংটন এই দ্বন্দ্বটি জোরে সমাধান করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।
এরপর কী আসে:
চুক্তিটি স্পষ্টভাবে নতুন সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত এবং তুর্কি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই তা বলেছেন। শেষ পর্যন্ত এই সংগঠনটি আমেরিকা-পরবর্তী উপসাগরীয় আদেশের একটি টেকসই স্তম্ভে পরিণত হবে, নাকি এটি তৈরিকৃত যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বাগদাদ চুক্তির ভাগ্য পুনরাবৃত্তি হবে, তা নির্ভর করবে এমন কিছুর উপর, যা কোনো স্বাক্ষর অনুষ্ঠান নিষ্পত্তি করতে পারবে না। তা নির্ভর করবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ বন্ধ হওয়ার পর রিয়াদ, আঙ্কারা এবং ইসলামাবাদ আসলেই একই জিনিস চায় কিনা। -জাসিম আল-আজ্জাওয়ি, এমবিসি, আবুধাবি টিভি এবং আল জাজিরা ইংলিশ সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক ও নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের সংবাদ কভার করেছেন, বিশ্বনেতাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এবং গণমাধ্যম বিষয়ক কোর্সও পড়িয়েছেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button