‘সভ্যতার সঙ্ঘাত’ এর তত্ত্ব দেবেন না

Mahathir[মালয়েশিয়ার দীর্ঘ দিনের প্রধানমন্ত্রী (১৯৮১-২০০৩) ডা: মাহাথির মোহাম্মদ শুধু সে দেশের উন্নয়নের অনন্য রূপকারই নন। তিনি মুসলিম বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রনায়কদের একজন। সরকার পরিচালনা থেকে বিদায় নিলেও তিনি স্বদেশে ও বিদেশে লেকচার, লেখালেখি প্রভৃতির মাধ্যমে ব্যস্ত জীবনযাপন করছেন। প্রায় ৯০ বছর বয়সেও মাহাথির মোহাম্মদ সক্রিয় রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে আইএস জঙ্গিদের উত্থান, ইসরাইলের অব্যাহত দখলদারি এবং পাশ্চাত্যের মুসলিমবৈরী মনোভাব বজায় থাকার প্রেক্ষাপটে তিনি এই নিবন্ধ লিখেছেন সম্প্রতি চেচনিয়ায় অবস্থানকালে।]
ব্রিটেনের মুসলিম নাগরিকেরা কথিত জিহাদি হয়ে যাচ্ছে এবং ‘ইসলামিক স্টেট’ (আইএস) বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে দেখে ব্রিটিশ জাতি বিভ্রান্তির কবলে পড়েছে। জন নামের জনৈক ব্রিটিশ নাগরিক এবং আইএস সদস্য একজন মার্কিন সাংবাদিকের শিরোচ্ছেদ করায় ব্রিটেনের মানুষ আতঙ্কিত।
অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, আতঙ্কিত আমি নিজেও। কারণ এটা মেটেও ইসলামসম্মত কোনো কাজ নয়। ইসলাম সন্ত্রাস-সহিংসতা সমর্থন করে না। রাসূল সা: যাদের পরাজিত করেছিলেন, তাদের হত্যা করা দূরের কথা, ধর্মান্তরিত করে মুসলমানও বানানো হয়নি। আল কুরআন বলছে, ‘ইসলামে নেই কোনো জবরদস্তি।’
অথচ আমরা দেখছি, মুসলমানেরা ক্রমবর্ধমান হারে সন্ত্রাস ও নৃশংসতায় লিপ্ত হচ্ছে। এখন আমরা দেখছি আইএস ‘জিহাদি’দের আবির্ভাব। তাদের কিছু লোক উন্নত জীবনযাত্রার যেসব দেশে অভিবাসী হয়েছিল, সেখান থেকে যুদ্ধে গেছে। ভালোভাবে জীবনযাপন করা সত্ত্বেও কেন ওরা বিপজ্জনক জীবন বেছে নিয়েছে? তারা ওদের বিরুদ্ধে লড়ছে যাদের দেশে তারা ঠাঁই পেয়েছিল।
ইউরোপের ‘গ্রেট গেম’
সম্প্রতি আমরা দেখলাম, গাজায় ইসরাইল মুসলমানদের গণহত্যার শিকারে পরিণত করেছে; তাদের শহরগুলো ও ঘরবাড়ি করা হয়েছে ধ্বংস। গাজায় দুই হাজারের বেশি মুসলিম নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছোট্ট শিশু, বৃদ্ধ, বেসামরিক লোকজন সবাই ছিলেন। হাজার হাজার মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। অনেকেই হারিয়েছেন হাত-পা।
ইউরোপ ও আমেরিকা তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখায়নি। উদ্বিগ্ন হয়নি গাজার ঘটনায়। আসলে আরো মুসলমান হত্যা এবং তাদের বসতি ও জনপদ ধ্বংসের জন্য ইসরাইলকে দিয়েছে অর্থ ও অস্ত্র।
একজন ইউরোপীয় সাংবাদিকের শিরোচ্ছেদ যদি মুসলমানদের বর্বরতার প্রমাণ হয়, গাজায় মুসলমানদের হত্যা করা কি ইসরাইলের নৃশংসতার সাক্ষ্য দেয় না? না, এমনটা মনে করা হয় না। হাবভাব এমন, যেন ফিলিস্তিনিরা সন্ত্রাসী; এমনকি তাদের শিশুরাও। ধরে নেয়া হয়, ইসরাইল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং গাজাবাসীকে হত্যা, তাদের ঘরবাড়ি ও শহরগুলো ধ্বংস করে দেয়ার পুরো অধিকারই ইসরাইলের রয়েছে।
অতীতের দিকে তাকালে আমরা স্বীকার না করে পারি না যে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানেরা আগে ইউরোপিয়ানদের প্রতি খুবই সহৃদয়তার পরিচয় দিয়েছে। অথচ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সে অঞ্চলে তাদের গ্রেট গেম খেলেছে। তারাই ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন নামে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র বানিয়েছে। কিন্তু এগুলো আগে ছিল একক রাষ্ট্রের অংশ যা আরবদের কাছে ‘শাম’ নামে পরিচিত। তখন মুসলমানেরা নিজেদের শুধু মুসলিম বা উম্মাহ মনে করত।
ইউরোপিয়ানরা আরব থেকে তুর্কিদের বহিষ্কার করল এবং শামকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করার উদ্যোগ নিল। অথচ তারা আরবদের কাছে ওয়াদা করেছিল, শামকে মুক্ত করে আরবদের হাতে তুলে দেয়া হবে।
এরপর ইউরোপিয়ানদের গ্রেট গেমের পরিণামে ইরাক গেল ব্রিটেনের হাতে। আর সিরিয়া-লেবানন পেল ফ্রান্স। ফিলিস্তিনকে করা হলো ব্রিটিশ ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত ভূখণ্ড। কথা ছিল, পরে তা ফিলিস্তিনি জনগণকে ফিরিয়ে দেয়া হবে। শত শত বছর ধরে ফিলিস্তিনে মুসলমান ও খ্রিষ্টান আরব এবং স্বল্পসংখ্যক ইহুদি বাস করে এসেছেন। মুসলিম শাসনাধীনে এই অমুসলিমরা ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও বাস করেছেন শান্তিতে।
ব্রিটিশরা ইসরাইল সৃষ্টি করেছে
ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ইউরোপের ইহুদি সমস্যার সুরাহার জন্য ফিলিস্তিনের বুকে ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করা হবে। ১৯১৭ সালে (ব্রিটিশ নেতা) বালফোর ওয়াদা করে বসলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের ভূমি ইহুদিবাদীদের দেয়া হবে।’ কত সহজেই না এটা করা হলো। ফিলিস্তিনের বাসিন্দা, সংখ্যাগরিষ্ঠ আরবদের কোনো তোয়াক্কাই না করে তাদের ভূমি জোর করে ছিনিয়ে ইহুদিদের দেয়া হয়েছিল। ওরা ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করাকে উদযাপন করেছিল আরবদের গণহত্যা আর তাদের ফিলিস্তিন থেকে বের করে দিয়ে। ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘ এসবের দৃশ্যত অনুমোদন দিয়েছে ইসরাইলের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। আরবদের ক্ষোভ ও বিরোধিতা পাত্তা পেল না।
তখন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো শান্তি নেই। যতবার ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বদেশ ভূমি পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছে, ইসরাইলকে ইউরোপ এবং বিশেষত আমেরিকা বিপুল সাহায্য-সহায়তা জুগিয়ে ততবারই এটা ঠেকিয়ে রেখেছে।
যতই আরবেরা এতে ব্যর্থ হয়েছে, ততই আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে এবং স্বদেশ উদ্ধারের দৃঢ়প্রত্যয় হয়েছে আরো জোরদার। এ দিকে আরব রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনিদের সাহায্য দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু হতোদ্যম না হয়ে ফিলিস্তিনিরা গঠন করল ‘আল ফাতাহ’। সাঁজোয়া যানবাহী ইসরাইলি সৈন্যদের পাথর ছোড়া শুরু হলো। শিশুরা পাথর ছুড়ে মারলে এই সৈন্যরা প্রথমে রাবার বুলেট এবং পরে সত্যিকার বুলেট ব্যবহার করতে শুরু করে দেয়।
আল ফাতাহ আত্মরক্ষার জন্য অকার্যকর কিছু অস্ত্র জোগাড় করেছিল। তাদের গুলি ছুড়ে হত্যা করা হতে থাকে। হাজার হাজার আরব হলো গ্রেফতার। বিনা বিচারে তাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য ইসরাইলি কারাগারে কাটাতে হয়েছে। অপর দিকে, ফিলিস্তিনের ভূমি জবরদখল এবং সেখানে ইহুদি বসতি নির্মাণ চলতে থাকে। ইউরোপিয়ানরা যেসব আইন ও নিয়মকানুনের জন্য গর্ববোধ করে, ইসরাইলের এ ধরনের কর্মকাণ্ড তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তবুও ইউরোপ ইসরাইলকে না থামিয়ে বরং অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য অব্যাহত রাখে।
ইসরাইল ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে সেখানে রাস্তায় বসিয়েছে প্রতিবন্ধক, যেন ফিলিস্তিনিরা অবাধে চলাচল করতে না পারে। শুধু ইসরাইলিদের জন্য কিছু রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। ওদের নিরাপদ রাখতে তোলা হয়েছে উঁচু উঁচু দেয়াল। গাজাকে ইসরাইল করে রেখেছে অবরুদ্ধ। এমনকি সাগরে আন্তর্জাতিক পানিসীমার ভেতর থেকেও জাহাজ আটক করেছে ইসরাইল।
পশ্চিমা অক্ষশক্তির ‘অবদান’ এসব
গভীর সাগরে গিয়ে ইসরাইল ত্রাণবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে ত্রাণকর্মীদের। সে জাহাজ দখলে নিয়ে ইসরাইলি বন্দরে ভিড়তে বাধ্য করা হয়েছে। জাহাজের যাবতীয় ত্রাণসম্ভার করা হয়েছে বাজেয়াপ্ত। এসব আচরণ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তবুও বৃহৎ শক্তিগুলো কোনো পদক্ষেপই নেয়নি।
এখানেই শেষ নয়। ইউরোপিয়ানরা অন্যত্রও ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধী মানসিকতা প্রদর্শন করেছে। এর বাস্তব প্রমাণ হলো, ‘সভ্যতার সঙ্ঘাত’-এর পূর্বাভাস দেয়া।
ইউরোপের বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় ১২ হাজার মুসলমানকে (তাদের মধ্যে অল্পবয়সী বালকেরাও ছিল) কুড়াল ও ভারী কাঠ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে সেখানে ন্যাটো মোতায়েন করেছিল ডাচ সৈন্যদের। ওদের দায়িত্ব ছিল মুসলমানদের রক্ষা করা। কিন্তু ওরা সরে গিয়ে ঘাতক সার্বদের সুযোগ করে দেয় যাতে তারা সে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারে।
এরপর ঘটল আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন। নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার (বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র) ধ্বংসের জন্য মুসলমানদের দায়ী করে এসব করা হয়েছে। ইরাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো, দেশটির হাতে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে এবং এটা মাত্র ৪৫ মিনিটেই ব্রিটেনকে টার্গেট করে প্রয়োগ করা যায়।
পরে ব্রিটেনই স্বীকার করেছে, এই অভিযোগ ছিল মিথ্যা। তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ইরাক দখলের অভিযানে আমেরিকার দোসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কোনো লজ্জাবোধ না করেই ব্লেয়ার দাবি করেছেন, ইরাকিদের সাদ্দাম হোসেনের হাত থেকে মুক্ত করার জন্যই ইরাকে হামলা করা হয়েছিল। এতে দেশটির নগর ও শহরগুলো ধ্বংস হয়ে যায় এবং নিহত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ।
সাদ্দামকে ধরে ফাঁসিতে ঝোলানো হলো। অথচ দখলদারি ও যুদ্ধ চলতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত আমেরিকা-ইউরোপের সৈন্যরা যখন ইরাক ছেড়ে যায়, এক সময়ের স্থিতিশীল ও প্রগতিশীল আরব দেশটি নৈরাজ্যে নিপতিত হয়। গৃহযুদ্ধে ইরাকিরা হত্যা করতে থাকে ইরাকিদের।
অপর দিকে, আফগানিস্তানে হামলা চালানো হলো শাসনক্ষমতা থেকে তালেবানদের উৎখাত এবং ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার জন্য। ওসামা মারা গেছেন। কিন্তু দেশটিতে নেই কোনো শান্তি।
ইরাক ও আফগানিস্তান এই দু’টি দেশে মাত্র তিন মাসেই সামরিক অভিযান শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু দশটা বছর পার হয়ে গেছে। দেশ দু’টি প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত। এত কিছুর পরও অর্থবহ গণতন্ত্র ও শান্তি দুর্ভাগা মানুষের কপালে জোটেনি। দেশ দু’টি পুরোপুরি অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। ভ্রাতৃঘাতী লড়াই তাদের করে দিচ্ছে ছিন্নবিচ্ছিন্ন।
সিআইএর তালিকা ও মুসলিম হত্যা
সিআইএ মুসলমানদের তালিকা বানিয়েছে, যাদের হত্যা করা হবে। পাশ্চাত্য জগৎ বিনাবিচারে আটকে রাখার নিন্দা জানিয়ে থাকে। এখন আমরা দেখছি, পাশ্চাত্যে বিনাবিচারেই মুসলমানদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হচ্ছে। যাদের এ দণ্ড প্রদান করা হয়, তাদের কিন্তু তা জানানো হয় না। এমনকি তাদের গ্রেফতার করার চেষ্টাও দেখা যায় না। এসব মুসলমানকে খতম করার জন্য শুধু ড্রোন পাঠিয়ে দেয়াই যথেষ্ট মনে করা হয়।
ওসামা বিন লাদেনের ক্ষেত্রে ঘাতক বাহিনীকে পাকিস্তানে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল সে দেশের সরকারকে না জানিয়েই। ওসামার লাশ সাগরে ছুড়ে ফেলা হলো, যা বর্বরদের কাজ ছাড়া কিছু নয়।
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশ তাদের হাতে নিহত মুসলমানদের জন্য কোনো দুঃখ বা সহানুভূতি প্রকাশ করেনি। হাজার হাজার মুসলিম নর-নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও রোগী নিহত হয়েছেন, হচ্ছেন। কিন্তু পাশ্চাত্যের এ জন্য সামান্য উদ্বেগ বা দুঃখ নেই।
যা হোক, আইএস যা-ই দাবি করুক, আমি মনে করি মার্কিন সাংবাদিকের শিরচ্ছেদ করা ইসলাম সমর্থিত কাজ নয়। এমন আচরণ মুসলমানদের জন্য লজ্জাকর। কারণ এটা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। কিন্তু কোনো মুসলিম তরুণ যদি একই ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের ওপর নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে নৃশংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তাকে কি দোষ দেয়া যায়?
কোনো মুসলমানকে ইসলাম জঘন্য কাজ করতে প্ররোচিত করে না। এমন কিছু ঘটানোর কারণ, ক্রোধ ও ঘৃণা। ইউরোপসহ পাশ্চাত্যকে জনগণের ওপর নির্যাতন থেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়ে এমন কর্মকাণ্ডে মেতে উঠছে। অপর দিকে, ইউরোপের বেশির ভাগ লোক ধর্মকর্ম করা খ্রিষ্টান না হলেও একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়, যখন তারাও মুসলমানদের মতো হুমকির সম্মুখীন হয়।
ইউরোপিয়ানদের অতীতের দিকে তাকিয়ে দেখুন। বিশেষ করে, তারা ইসরাইলের জন্ম দেয়ার পর আমরা কী দেখেছি? স্বীকার করবে না ঠিকই, তবে বাস্তবতা হলো তারা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড চালিয়ে যাচ্ছে।
এটা সালাহুদ্দীনবিহীন ক্রুসেড
এটাকে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ বলুন আর সভ্যতার সঙ্ঘাত বলুন; প্রকৃতপক্ষে এটা হচ্ছে বিগত শতাব্দীগুলোর ক্রুসেডের ধারাবাহিকতা।
আধুনিক যুগের এ ক্রুসেডের বিরুদ্ধে মুসলমানদের নেই কোনো জবাব। নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তাদের নেই একজন সালাদিন (সালাহুদ্দীন আইউবী)। কয়েক শ’ বছর ধরে তারা নিজেদের দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগ দিয়েছে। তারা আল কুরআনে বর্ণিত, আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালনে অবহেলা দেখিয়েছে। কুরআনের শিক্ষা হলো, উম্মাহ ও ইসলামকে রক্ষার জন্য তাদের প্রস্তুত থাকতে হবে অবশ্যই।
মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষাদাতারা তাদের বলেন আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে। কিন্তু এটা জানাতে অবহেলা দেখান যে, আল কুরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন মুসলিমরা প্রথমে নিজেদের সাহায্য করার জন্য। তা হলে আল্লাহ তাদের মুনাজাত কবুল করবেন। মুসলমানেরা যে, এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করেনি, তা সুস্পষ্ট। এমনকি অনেকের বিশ্বাস পাশ্চাত্যের হাতে নির্যাতিত হওয়া তাদের পূর্বনির্ধারিত নিয়তি।
আজ কোনো মুসলিম দেশের সরকারই ইউরোপ, তথা পশ্চিমাদের চ্যালেঞ্জ করার সাহস রাখে না। আসলে অনেকের বিশ্বাস, ‘ইউরোপিয়ানরা উন্নত প্রজাতির মানুষ। তাই তারা অন্যদের ‘দেখাশোনা’ করা উচিত। একই কারণে তাদের আগ্রাসন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার প্রয়াস বৃথা।’
মুসলিম দেশগুলোর সরকারের কাছ থেকে কোনো সাহায্যের আশা না রেখে ক্রুদ্ধ ও হতাশ অনেক মুসলমান প্রতিশোধ নিতে নিজেরাই উদ্যোগী হয়েছে। এই লক্ষ্যে ওরা ইসলামের ব্যাখ্যা দেয় নিজেদের মতো করে, যাতে তরুণেরা জীবন বিলিয়ে দিতে রাজি থাকে।
সব মুসলিম বিশ্বাস করেন, ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেলে শহীদের মর্যাদা এবং বেহেশতে স্থান পাবেন। মুসলমানেরা অবিচার-অত্যাচারের শিকার। তাই তরুণদের এটা বোঝানো তেমন কঠিন নয় যে, পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে লড়াই মানে ‘পবিত্র যুদ্ধ।’
কিন্তু এ যুদ্ধে জয়ী হওয়া সহজ নয়। সন্ত্রাস চালিয়ে প্রতিশোধের চেষ্টা করা সে তুলনায় অনেক সহজ। তাই কথিত জিহাদিরা শিরñেদ করা এবং তার ছবি দুনিয়াকে দেখানোর মতো বর্বরতা প্রদর্শনেও রাজি।
শিরোচ্ছেদ করা ইসলামপরিপন্থী
আবারো বলব, শিরোচ্ছেদের এই কাজ ইসলাম অনুমোদন করে না। আটক শিয়াকে সুন্নিরা অথবা সুন্নিদের শিয়ারা গণহত্যার শিকারে পরিণত করাও ইসলামবিরোধী। মুসলমানদের এই দুই অংশ সর্বদাই পরস্পর লড়াই করে এসেছে। এটা ঘটেছে এ বিশ্বাস থেকে যে, অপর পক্ষ মুসলমান নয়। কিন্তু আজ যা ঘটছে, তা রক্তপিপাসা।
ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হওয়া এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পর এটা বেড়েছে। ইহুদি এবং তাদের ‘নাম-কা-ওয়াস্তে’ খ্রিষ্টান মদদগারদের হারাতে মুসলমানেরা অক্ষম। এখন তারা নিজেদের মধ্যে সঙ্ঘাতে লিপ্ত। এ অবস্থায় যখন পাশ্চাত্যের বিধর্মী কাউকে ধরা হচ্ছে, তার ওপর সব ক্ষোভ ও ঘৃণা গিয়ে পড়ছে।
ইসরাইল নামের রাষ্ট্র যতদিন থাকবে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের স্বদেশভূমি অর্জনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না যতদিন, সে পর্যন্ত কমবেশি এমন পরিস্থিতি থাকবে। দশকের পর দশক; এমনকি কয়েক শতাব্দী ধরেও।
ফিলিস্তিন জবরদখল করে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা মুসলমানদের মধ্যে সহিংস প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। আর ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের জবাব ইহুদিরা দিচ্ছে আরো বেশি সহিংসতার মধ্য দিয়ে। এ অবস্থায় অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানেরাও ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধ ঘোষণা সম্ভব নয় বলে সন্ত্রাসের দিকে ঝোঁক দেখা যায়। অপর দিকে ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বেড়েছে।
প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ পন্থায় ইসরাইলি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক ইউরোপসহ পাশ্চাত্য। এটা অব্যাহত রয়েছে। এখন এর সমাধানের উপায় কী? মুসলমানদের বিশেষত ফিলিস্তিনিদের আরো দমিয়ে রাখা এবং তাদের ওপর নির্যাতন বৃদ্ধি করা যে সঙ্কট নিরসন করবে না, তা নিশ্চিত। সমাধানের পথ হলো, ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ন্যায়নীতি ও সুবিচার কায়েম করা।
এ লেখা লিখছি চেচনিয়ায় বসে। এটি রাশিয়ার একটি প্রজাতন্ত্র। চেচেনরা রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে স্বাধীনতার জন্য। তবে এ যুদ্ধ ব্যর্থ হয়েছে। অস্ত্রশস্ত্রের দিক দিয়ে দুর্বল, ত্রিশ লাখ চেচেন লড়াই করেছে বিশ কোটি রাশিয়ানের বিরুদ্ধে। রাশিয়া বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামরিক শক্তিগুলোর একটি। গ্রোজনিসহ চেচনিয়া ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল। চেচেনরা বাধ্য হয়েছিল যুদ্ধ থামাতে।
চেচনিয়ার ঘটনার শিক্ষা
যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর রাশিয়া চেচনিয়া এবং (এর রাজধানী) গ্রোজনি পুনর্নির্মাণের জন্য এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলার বরাদ্দ করেছে। সে যুদ্ধের আট বছর পর এখন আর কোনো চিহ্নই নেই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের। রুশ মিসাইল ও বোমা এটা ঘটিয়েছিল। এ দিকে চেচেনরা মুসলমান হিসেবে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস লালন এবং রীতিনীতি পালন করে যাচ্ছেন।
চেচনিয়ায় চমৎকার মসজিদ-মাদরাসা অনেক। কমিউনিস্টরা ইসলামের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করার সে দিন আর নেই। চেচনিয়া রুশ ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত। তবে ধর্মকর্মসহ অনেক দিক দিয়ে চেচনিয়া স্বাধীন। রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক এখন বন্ধুসুলভ।
চেচেনদের কাহিনী থেকে হয়তো কিছু শিক্ষা নেয়া যেতে পারে। বলতে চাই, ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করো। ক্রুসেড থামাও। ‘সভ্যতার সঙ্ঘাত’ তত্ত্ব তুলে ধরা বন্ধ হোক। (মুসলিম বিশ্বে) সরকার পতনের কারসাজি বন্ধ করো। মুসলমানদের একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অস্ত্র জোগান দেয়া বন্ধ করো। এসব করতে হয়তো সময় লাগবে। তবে ‘জিহাদিরা’ যুদ্ধ করার সুযোগ তখন আর পাবে না।
আল্লাহ তায়ালারা বলছেন, মুসলমানদের দুশমন ওরাই যারা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও নির্যাতন করে। যারা মুসলমানদের আক্রমণ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে যেন কিছুতেই যুদ্ধ না করে। এটাই ইসলামের পন্থা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা না করা পর্যন্ত শান্তি।
মুসলমানদের মধ্যে যারা এসব নীতি-নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলেন এবং অমুসলিমদের সাথে শান্তিতে বাস করতে চান, শুধু তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে পারে।
ভাষান্তর: মীযানুল করীম

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button