‘পিস বোর্ড’ ইসরায়েলি ঔপনিবেশিকতার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ
২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল কর্তৃক গাজায় গণহত্যা শুরু হওয়ার তিন বছর পর ‘পিস বোর্ডে’র উদ্বোধনী সভা অনুষ্ঠিত হয় ওয়াশিংটন ডিসির ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প ইনস্টিটিউট অফ পিসে। সেখানে জড়ো হওয়া বিশ্বনেতৃবৃন্দ এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের সমাবেশে পিস বোর্ড একটি বিবৃতি জারি করে, যেখানে একটি বাক্য বিশেষভাবে আলাদাভাবে নজরে আসে। বাক্যটি হলো: “প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের জনগণের কাছে তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন।” এই বাক্যটি হামাসের ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার কথা বোঝায়, কিন্তু পুরো বিবৃতিটি এমন একটি অতিরিক্ত ওজন বহন করে যা ফিলিস্তিনিদের বর্ণনা বা বয়ান থেকে সরিয়ে দেয়।
উপনিবেশবাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, গাজার বিশেষ ইতিহাস এবং এই গণহত্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, পিস বোর্ডের বিবৃতিতে ইসরাইলের প্রতি তাদের আনুগত্যের বিষয়টিও প্রকাশ হয়ে পড়েছে: “ইসরায়েলের জন্য প্রকৃত এবং টেকসই নিরাপত্তা হলো এমন একটি ভিত্তি যার ওপর যেকোনো শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, এবং এটিই সবচেয়ে নিশ্চিত গ্যারান্টি যে, ভবিষ্যতে আর কোনো ৭ অক্টোবর ঘটবে না।”
কথা হচ্ছে, ৭ অক্টোবর মূলত এড়ানো যেতো, যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ‘দ্বি-রাষ্ট্রীয় রাজনীতি’কে একমাত্র সমাধান না বানাত, যা ইসরায়েলকে ফিলিস্তিন উপনিবেশ করার সুযোগ করে দিয়েছে। এছাড়া, কেবল সাম্প্রতিক ইতিহাস বিবেচনায় নিলেও ৭ অক্টোবর এড়ানো যেতো, যদি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর কাছে আসা সতর্কতাগুলোতে কান দিতেন। হারেৎজ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহু সংযুক্ত আরব আমিরাতের সতর্কতার জবাবে বলেছিলেন যে, ইসরায়েল যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল, এবং সিআইএ-র সতর্কতার বিষয়টিকে তিনি দখলকৃত পশ্চিম তীরের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। অতএব, ইসরায়েল গণহত্যা চালানোর জন্য প্রস্তুত ছিল। এটি কেবল উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় ছিল। ৭ অক্টোবর আর কখনো না घটার একমাত্র গ্যারান্টি হতে পারে ইসরায়েলের কাছ থেকে একটি নিশ্চয়তা পাওয়া, যা অবশ্যই সম্ভব না।
পিস বোর্ড পরিষ্কার করেনি যে ‘ইসরায়েলের জন্য প্রকৃত এবং টেকসই নিরাপত্তা’ বলতে ঠিক কী বোঝায়, আর গাজার নিরস্ত্রীকরণ এবং উগ্রবাদ দূরীকরণ-এর ব্যাপারে অস্পষ্ট ও গতানুগতিক উল্লেখ ছাড়া আর কিছুই বলা হয়নি তাদের বিবৃতিতে।
যাহোক, এখন পর্যন্ত নিরস্ত্রীকরণ এবং উগ্রবাদ দূরীকরণের আড়ালে যা রয়েছে তা হলো, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক দখলদারিত্ব, যা ইসরায়েলি সরকার স্থায়ী হবে বলে ঘোষণা করেছে। আবারও বলছি, ঐতিহাসিক নজির অনেক রয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা এখন ইসরায়েলের একটি স্থায়ী কৌশলে পরিণত হয়েছে। তবে এই স্থায়িত্বকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বাভাবিকীকরণ করে নিয়েছে। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়ার চেয়ে নিরাপদ কাজ আর কিছু হতে পারে না, যদিও প্রকৃতপক্ষে এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। পিস বোর্ডের জন্য এই রাজনীতি নতুন কিছু নয়। এর হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ বা উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ বহু বছর ধরে জাতিসংঘের কূটনীতিতে অবদান রেখেছেন।
পিস বোর্ড যখন বলে যে তারা তাদের মেন্ডেট বা দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ (যেমনটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে), তখন বাস্তবে জাতিসংঘের সাথে এর খুব একটা পার্থক্য থাকে না। ইসরায়েলের সাথে জাতিসংঘের দশকের পর দশক ধরে সহযোগিতা ছিল। পিস বোর্ড সবেমাত্র শুরু করেছে, এর অনেক পথই পূর্বের অপরাধমূলক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আগেই তৈরি হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিবর্তন ছাড়া, পিস বোর্ড তার মেন্ডেট পূরণ করবে, যদিও কাগজে-কলমে যে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে তা নয়। জাতিসংঘের মতোই, এটি বড় বড় পরিকল্পনা এবং নিরাপদ বাকচাতুরীর আড়ালে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করবে, অথচ ইসরায়েলকে তার ঔপনিবেশিক বিস্তার বিনা বাধায় চালিয়ে যেতে দেবে।
যদি ‘পিস বোর্ড’ তার মেন্ডেট বা দায়িত্ব পূরণ করে, তবে এটি নিশ্চিত করবে যে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি স্থায়ী থাকবে, গাজা ফিলিস্তিনি শূন্য হবে এবং ঔপনিবেশিক বসতি গড়ে উঠবে। তবে সত্য হলো, ফিলিস্তিনীদের জন্য টেকসই নিরাপত্তা উপনিবেশকরণ বন্ধের ওপরই নির্ভরশীল, যে উপনিবেশকরণ ফিলিস্তিনীদের জাতিগত নির্মূল ও তাদের নিরাপত্তা বিপন্ন করার মধ্যে নিহিত। -রামোনা ওয়াদি, একজন স্বাধীন গবেষক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, বই পর্যালোচক ও ব্লগার। তাঁর লেখালেখির মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিন, চিলি ও লাতিন আমেরিকাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যু।
[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]



