জোট আর ভোট: জনমতের গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তাব

আশরাফ আল দীন: ইদানীং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং মিডিয়াতে যে বিষয়টা খুব বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে তা হলো, কোন দল কাদের সাথে জোটবদ্ধ হচ্ছে। আর কোন কোন দল আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন জোট গঠন করছে। ইত্যাকার সব সম্ভাবনা, ঘটনা ও রটনা। কথা আছে, এ বছরের ডিসেম্বর নাগাদ আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ জন্য রাজনৈতিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বলা যায়। ক্ষমতাসীন দল তো ইতোমধ্যে সভা করে জনগণের কাছে ভোট চাইতে শুরু করেছে। অন্যরা যদিও, বিশেষত বিএনপি এখনো সভা করার অনুমতি ঠিকমতো পাচ্ছে না, সেটা অবশ্য রাজনৈতিক আচরণের ভিন্ন প্রসঙ্গ। মোটকথা, জোট নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবছেন সবাই এবং অনেকেই কথা বলছেন।

সম্প্রতি প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজ চিন্তক প্রফেসর এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন, ‘প্রশ্ন উঠেছে, জোট গড়া হচ্ছে কেন? দেশের স্বার্থে না দলের স্বার্থে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিলেতে কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টি জোট গড়েছিল। গঠন করেছিল জোট সরকার। লক্ষ্য ছিল যুদ্ধে জার্মানি, ইতালি ও জাপানকে পরাজিত করা। এর মূলে ছিল দেশের স্বার্থ; কোনো বিশেষ দলের স্বার্থ নয়। কিন্তু আমাদের দেশে জোট গড়া হচ্ছে মূলত দলের স্বার্থে, দেশের স্বার্থ ভেবে নয়। এটাও দেশের রাজনীতিতে সৃষ্টি করছে জট। (নয়া দিগন্ত, ৮.৯.১৮)
প্রধান যে দুই রাজনৈতিক দল, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি, তাদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা যথাক্রমে ১৪ দল ও ২০ দলীয় জোট, এর মধ্যেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই।

কার স্বার্থে এসব নতুন জোট অথবা পুরানো জোটগুলোর বাঁক বদল? ক্ষমতার সুস্বাদু ‘মুরগি মোসাল্লাম’টাকে ভাগবাটোয়ারা করে খাওয়ার জন্যই এটা হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। বিশেষত ড. কামাল হোসেন, ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব প্রমুখের একই মঞ্চে এসে যুক্তফ্রন্ট গড়ার তোড়জোড় দেখে অনেকেই রসিকতা করে বলছেন : ‘প্রবীণ হিতৈষী সংঘ’ গঠন করা হচ্ছে ‘ক্ষমতার স্বাদ’ নেয়ার জন্য। এতে জনগণ বা দেশের উন্নতির খুব একটা আশা কেউই করছে না। কারণ, সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তারা দেশের বা দশের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু করেছেন বলে জনগণ মনে করতে পারছে না! জীবনের ক্রান্তিকালে এসে তারা যে নতুনভাবে কিছু করবেন, এমন আশা করতে পারছে খুব কম লোকই। ফলে প্রত্যেকের মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে নতুন কোনো আশার কথা শোনার বাসনা। আমরা কি চিন্তা করতে পারি নতুন কোনো রাজনৈতিক পদ্ধতির কথা?

এবার ভোটের কথায় আসি। জাতীয় নির্বাচনের ভোট যদি বিশুদ্ধভাবে হয় তবেই না রাজনীতি ও জাতীয় উন্নতির কথা! তা না হলে তো সবই গুড়েবালি! আমরা কি এটুকু নিশ্চয়তা জাতিকে দিতে পারি যে, আমরা একটি পরিচ্ছন্ন নির্বাচন করব, যাতে কোনো প্রকার মাস্তানি, দলীয় আধিপত্য অথবা স্বেচ্ছাচারিতার কারণে, গণতন্ত্রের প্রাণতুল্য ‘জনগণের ভোটাধিকার’ নষ্ট হবে না? ভোটের নামে নানা ছলচাতুরী করে, মিথ্যাচার ও ধাপ্পাবাজির আশ্রয় নিয়ে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে, বুটের নিচে গণতন্ত্রকে মাড়াতে মাড়াতে ক্ষমতা যে দখল করা যায় এবং পুরো পাঁচ বছর (বা প্রয়োজনে আরো বেশি সময়) তা উপভোগও করা যায়, কিন্তু দেশে-বিদেশে কোথাও স্বীকৃতি পাওয়া যায় না, এ কথা বর্তমান সরকার হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। তারা যদি আবারো একই পথে হাঁটেন এবং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চান, তা তারা হয়তো পারবেন। তবে এতে স্বাধীন বাংলাদেশের মর্যাদার ওপর যে বিরাট আঘাত আসবে এবং রাষ্ট্রটাকে একটি বিস্ফোরণোন্মুখ বিসুভিয়াসের শিখরে বসিয়ে দেয়া হবে, এ কথা বোঝার জন্য ‘রকেট সাইন্টিস্ট’ হওয়ার দরকার নেই।

তা হবে লখো শহীদের রক্তের প্রতি চরম অবিচার এবং এক অনিশ্চিত যাত্রার দ্বার উন্মোচন মাত্র। দেশপ্রেমিক যেকোনো রাজনৈতিক দল, এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও, এই কথাগুলো বুঝে নিয়ে সঠিক এবং বিতর্কহীন নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করবে আশা নিয়েই পরের কথাগুলো বলছি।

আমাদের আসল প্রয়োজন হচ্ছে জনমতকে সম্মান করা এবং গুরুত্ব দেয়া। ‘জনমত’ মানেই ‘গণতন্ত্র’। জনমতকে সম্মান করা মানেই গণতন্ত্রকে নিজেদের মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় প্রতিষ্ঠা করা। জনমতকে সঠিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে গণতন্ত্রকে পূর্ণ মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমাদের প্রচলিত ‘জনমত যাচাই ও ক্ষমতা বদলের পদ্ধতি’ পরিবর্তন করতে হবে।

এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে, আমাদের প্রস্তাব অত্যন্ত সহজ এবং সুস্পষ্ট। প্রস্তাবটা নিম্নরূপ :
এক. সারা দেশে একযোগে ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ নীতির ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দুই. ভোট হবে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ওপর, কোনো ব্যক্তির ওপর নয়। উদ্দেশ্য প্রত্যেকটি দলের সমর্থক সংখ্যা যাচাই করা। তিন. প্রাথমিক ভোটে যেসব দল প্রদত্ত মোট ভোটের দশ শতাংশের কম ভোট পাবে, তাদের বাদ দিয়ে বাকি অর্থাৎ প্রধান দলগুলোকে নিয়ে দ্বিতীয় দফা জনমত জরিপের ভোট গ্রহণ করা হবে। চার. প্রধান দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হিসাব অনুপাতে সংসদের আসনসংখ্যা এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্য সংখ্যা প্রত্যেকটি দলের জন্য বরাদ্দ করা হবে। পাঁচ. সংশ্লিষ্ট দল নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীদের তালিকা দাখিল করবে। ছয়. সংসদ প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে, তবে প্রধানমন্ত্রী যে দলের হবেন সেই দল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য প্রার্থী দিতে পারবে না। সাত. নির্বাচন অর্থাৎ ভোট অনুষ্ঠানকে সব সন্দেহ ও জালিয়াতির ঊর্ধ্বে রাখার জন্য জাতীয় সংসদ নিজস্ব পদ্ধতি বের করবে। তা অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারও হতে পারে।

ইউরোপের অনেক দেশেই এ ধরনের পদ্ধতি চালু আছে। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, নানা কারণে আমাদের দেশে বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতি সুফল বয়ে আনছে না।
আসুন না, আমরাও সভ্য জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত হওয়ার জন্য নিজেদের কুৎসিত দিকগুলোকে মোচন করার প্রচেষ্টায় সঙ্ঘবদ্ধ হই।
লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা
ashr54@gmail.com

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button