এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে রেলপথে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ

Trainআদিত্য আরাফাত: এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে রেলপথে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। এ রেলওয়ে নেটওয়ার্ক মায়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-ইরান হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। আন্তর্জাতিক এ সংযোগের নাম ‘ট্রান্স-এশিয়ান রেল নেটওয়ার্ক’। এর মাধ্যমে দেশের রেলপথের সঙ্গে গড়ে উঠবে আন্তর্জাতিক সংযোগ।
ইতিমধ্যে এ সংযোগের আওতাভুক্ত দেশগুলো এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যেসব সমস্যা রয়েছে তা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারাও মনে করছেন, আন্তরিকতা ও আইনি সমঝোতা এবং কিছু সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলেই এ নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নে বাঁধা থাকবে না।
৪ করিডরের (নর্দান, সাউদার্ন, আসিয়ান এবং নর্থ সাউথ)  মাধ্যমে এই রেলওয়ে নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা ইতিমধ্যে প্রণীত হয়েছে। এর দক্ষিণ এশীয় করিডরের আওতায় যুক্ত হবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক। এদিকে এ নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে মিসিং লিংকগুলোয় (যে সব স্থানে রেল সংযোগ নেই) রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে চট্টগ্রামের দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-গুনধুম (মায়ানমার সীমান্ত) রেললাইন প্রকল্পের নির্মাণ কাজ একবছরের মধ্যে শুরু হবে। ইতিমধ্যে এ প্রকল্পের জন্য অর্থ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এছাড়া শিগগিরই রেলওয়ে কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনরায় চালু করা হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. তাফাজ্জল হোসেন বলেন, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক স্থাপনে যেসব সমস্যা রয়েছে আমরা তা দূরীভূত করার চেষ্টা করছি। দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-গুনধুম রেললাইন প্রকল্প এবং কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রিজিওনল কানেক্টিভিটি এবং ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক স্থাপনে সমস্যা দূরীভূত হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে তা দূর হয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৬০ সালে প্রথম জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (এসকাপ) ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে রেলওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সেই থেকে নানা চরাই উতরাই পেরিয়ে ২০০৬ সালে এসে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ওই বছর দক্ষিণ কোরিয়ার বুশানে ইকোনমিক অ্যান্ড সোস্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (এসকাপ) সম্মেলনে মোট ১৮ দেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশ ওই সময় সম্মেলনে অংশ না নেয়ায় চুক্তি স্বাক্ষরের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যান্য দেশকে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করার সময় বেঁধে দেয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ও শ্রীলঙ্কা আগেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। তারপর ২০১১ সালে ভারত ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
পণ্যবাহী কনটেইনার ট্রেন চালুর জন্য তুরস্ক থেকে ইরান, পাকিস্তান, ভারত হয়ে বাংলাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি রুট চিহ্নিত করেছে এসকাপ। এসকাপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ রুটে রেলপথ বিদ্যমান থাকায় এ কার্গো করিডোরটি সহজেই চালু করা সম্ভব; যা ইউরোপের সঙ্গে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ রুটে পণ্য পরিবহনে সময় কম লাগবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি দেশগুলোর রাজস্ব আয় বাড়বে; যা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
ইউরোপ ও এশিয়ার ২৬টি দেশকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে ট্রান্সএশিয়ান রেল রুট প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে এসকাপ। যাত্রী পরিবহনে নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও পণ্য পরিবহনে এ রেল নেটওয়ার্ক সহজেই চালু করা সম্ভব বলে মনে করে সংস্থাটি। ২০১৩ সালে ‘রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ইনক্লুসিভ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইকোনমিক কো-অপারেশন অর্গাইজেশনের (ইসিও) আওতায় ইস্তাম্বুল-তেহরান-ইসলামাবাদ (আইটিআই) রেল সংযোগ চালু রয়েছে। এ পথে তুরস্ক, ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে নিয়মিত কনটেইনার ট্রেন চলাচল করে। আর ১৭তম সার্ক সম্মেলনে বাংলাদেশ-ভারত-নেপালের মধ্যে কনটেইনার ট্রেন চলাচলে তিন দেশ সম্মত হয়। এর মাধ্যমে দিল্লি-কলকাতা-ঢাকা (ডিকেডি) রুটে ট্রেন চালু করা সম্ভব। যদিও কলকাতা-ঢাকা রুটে নিয়মিত যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। এর মাধ্যমে ইস্তাম্বুল-তেহরান-ইসলাবাদ-দিল্লি-কলকাতা-ঢাকা (আইটিআই-ডিকেডি) রুটে কনটেইনার ট্রেন চালু করা যাবে।
প্রস্তাবিত আইটিআই-ডিকেডি রেলওয়ে কার্গো করিডোর এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোকে যুক্ত করার মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
প্রসঙ্গত, আইটিআই রুটে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করছে ১৯৯৫ সাল থেকে। আর দিল্লি-লাহোর রুটে নিয়মিত যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। এক্ষেত্রে আইটিআই রুটের পণ্যবাহী ট্রেন কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়া সহজেই দিল্লি হয়ে কলকাতা পৌঁছতে পারবে। আবার কলকাতার সঙ্গে ঢাকার নিয়মিত ট্রেন যোগাযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা থেকে বীরগঞ্জ হয়ে নেপালের সঙ্গে রেলপথ রয়েছে। এক্ষেত্রে আইটিআই-ডিকেডি রুটে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ট্রানজিট চার্জ আরোপ করে রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে। বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ করিডোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইটিআই-ডিকেডি রুটে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও অনেক কমবে। বর্তমানে ভারত থেকে সরাসরি কোনো কনটেইনার এ দেশে আনা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে নৌপথে শ্রীলঙ্কা বা সিঙ্গাপুর হয়ে দেশে আসতে প্রায় এক মাস সময় লাগে। এতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি অনেকটা সময় অপচয় হয়। এজন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় মূলত বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকে। অথচ ট্রান্সএশিয়ান নেটওয়ার্ক চালু হলে সরাসরি রেলপথে তিন-চার দিনের মধ্যে ভারত থেকে এ দেশে পণ্য আমদানি করা যাবে।
এদিকে আইটিআই-ডিকেডি করিডোরটি ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে দিল্লি-হ্যানয় ও কুনমিং-সিঙ্গাপুর রেল লিংক চালু হলে পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে এ রুট ব্যবহার করা যাবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে ইস্তাম্বুলের রেল লিংক রয়েছে। তাই এ রুটের মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গেও সহজে রেল যোগাযোগ গড়ে তোলা সম্ভব।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ৯ জানুয়ারি ট্রান্সএশিয়ান রেলওয়েতে যুক্ত হতে ২০টি দেশ সমঝোতা স্মারকে সই করে। এর প্রথম অংশের কাজ ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। অথচ বাংলাদেশ অংশের একাধিক প্রকল্পের কাজ গত তিন বছরে অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সরকার এখন এসব প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগী হয়েছে।
এডিবি সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৩ বছরের (২০১৫-১৭) এডিবি বাংলাদেশকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রদান করবে। সেখানে রেল খাতই অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।
রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন,  দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-গুনধুম প্রকল্প মূলত ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের অংশ।প্রকল্পটিতে অর্থায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আশ্বাস পাওয়া গেছে। দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে ঘুনধুম পর্যন্ত মিটারগেজ রেলওয়ের একক লাইন নির্মাণসংক্রান্ত পূর্ববর্তী সম্ভাব্যতা, সমীক্ষা, বিপদ নক্সা ও দরপত্র আহ্বানসংক্রান্ত বিষয়াদি হালনাগাদকরণ বিষয়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে।
এদিকে এডিবি সূত্রে জানাগেছে, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে একই রেলপথে যুক্ত করতে কাজ করছে এডিবি। এ ক্ষেত্রে মিসিং লিংকগুলোয় (যে সব স্থানে রেল সংযোগ নেই) রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এডিবি সম্মত হয়েছে অর্থায়নে। -বাংলানিউজকে

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button