লেবানন ও ফিলিস্তিন জুড়ে মানচিত্রগত ডিজিটাল উপনিবেশবাদ

অ্যাপল ম্যাপস এবং গুগল ম্যাপস এখন বিশ্বের প্রাথমিক মানচিত্রগত কল্পনা হয়ে উঠেছে। দুই বিলিয়ন মানুষ এগুলোর মাধ্যমে পথ খুঁজে নেয়, এগুলোর ওপর বিশ্বাস রাখে, এগুলোর ওপর নির্ভর করে। যখন অ্যাপল ম্যাপস লেবাননের কোনো গ্রামের নামই দেখায় না—শুধু দক্ষিণে নয়, বরং পুরো দেশজুড়ে আর পাশের ইসরায়েলি ও সিরিয়ান এলাকাগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকে, তখন কেবল কয়েকটি বড় শহর: বেইরুত, টায়ার, সাইদন এবং অল্প কিছু অন্য শহর দেখা যায়, বাকি সব জায়গা পুরোপুরি ফাঁকা, তখন প্রশ্ন ওঠে: এটা কি স্থল আক্রমণের পরবর্তী ধাপ, এমনকি যুদ্ধবিরতির মধ্যেও? কে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে লেবাননের গ্রামগুলোকে অদৃশ্য করে দিতে হবে—কখন এবং কোন ভিত্তিতে?
গুগল ম্যাপসে পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলো এমনভাবে দেখানো হয় যেনো সেগুলো ইসরায়েলের ভেতরেই অবস্থিত। ইসরায়েল স্বীকৃতি দেয় না এমন ফিলিস্তিনি গ্রামগুলো হয় ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়, নয়তো পুরোপুরি বাদ পড়ে। এমনকি ছোট ইহুদি-ইসরায়েলি বসতিগুলো সহজেই দেখা যায়, অথচ ফিলিস্তিনি গ্রামগুলো দেখতে হলে প্রায় ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক বেশি জুম করতে হয়। ৭আমলেহ (আরব সোশ্যাল মিডিয়া উন্নয়ন কেন্দ্র) প্রকাশিত “ম্যাপিং সেগ্রেগেশন” নামে ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, গুগল ম্যাপস ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয় না, বরং ব্রাউজার একটি নামবিহীন এলাকায় নিয়ে যায় এবং পুরো ব্যবহার অভিজ্ঞতায় ইসরায়েলি দখলের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। একটি বেদুইন সম্প্রদায়, যারা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠনের আগেও ছিল, তাদের নিজস্ব নামের বদলে উপজাতীয় পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়। তাদের ঐতিহ্য ভূগোলের সঙ্গে সঙ্গে মুছে যায়।
ইসরায়েলি ঔপনিবেশিক সরঞ্জামের প্রোটোটাইপ:
এখন স্পষ্ট যে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখল যা করে, তা একধরনের পরীক্ষামূলক মডেল হিসেবে কাজ করে—কতদূর এগোনো যায় তা দেখার উপায় হিসেবে, যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলো হয় সম্পূর্ণ নীরব থাকে, নয়তো সর্বোচ্চ নিন্দা জানায়। ডিজিটাল উপস্থিতি থেকে এই সরাসরি মুছে ফেলা প্রথমে যতটা মনে হয় তার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। গবেষক মাইকেল কোয়েট “ডিজিটাল উপনিবেশবাদ” ধারণায় বলেন, ডিজিটাল ইকোসিস্টেম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো মানুষের কম্পিউটার-নির্ভর অভিজ্ঞতাকে নিয়ন্ত্রণ করে, যা তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই ক্ষমতা বাস্তব জীবনকে প্রভাবিত করে—অনেক ক্ষেত্রে জীবননাশীও হতে পারে।
জেরুজালেমে, আবু রাজাব পরিবারের মতো ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে নিজেদের বাড়ি নিজেরাই ভেঙে ফেলার আদেশ দেওয়া হয়। অমান্য করলে বাড়ি ভেঙে ফেলা হবেই, তার সঙ্গে এমন জরিমানা আরোপ করা হবে যা পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
অ্যাপল ম্যাপসে লেবাননের গ্রামগুলোর মুছে যাওয়া এবং একই সঙ্গে লেবাননের ভেতর দিয়ে নতুন সীমান্তরেখা আঁকা—এই একই যুক্তি অনুসরণ করে: ভবিষ্যতের বসতি স্থাপন ও উপনিবেশ স্থাপনের জন্য মানচিত্রগত প্রস্তুতি।
ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর অদৃশ্য হয়ে যাওয়া:
ঔপনিবেশিক মানচিত্র সবসময় এভাবেই কাজ করেছে। ১৯৪৯ সালের শেষ দিকে, ইসরায়েলি সরকার নয়জন পণ্ডিতের একটি কমিটি গঠন করে, যাদের কাজ ছিল নেগেভ অঞ্চলের শহর, পাহাড়, উপত্যকা, ঝরনা ও সড়কের জন্য হিব্রু নাম নির্ধারণ করা। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন লিখেছিলেন: “রাষ্ট্রের স্বার্থে আরবি নামগুলো সরিয়ে ফেলতে আমরা বাধ্য। যেমন আমরা আরবদের রাজনৈতিক মালিকানা স্বীকার করি না, তেমনি তাদের আধ্যাত্মিক মালিকানা এবং নামও স্বীকার করি না।”
এই নামগুলো কোনো বিমূর্ত বিষয় ছিল না। সাফুরিয়্যা—নাজারেথ অঞ্চলের একটি গ্রাম, হাজার মানুষের বাসস্থান। লিফতা—জেরুজালেমের পশ্চিম প্রান্তে, ১৯৪৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে ২,৫০০ ফিলিস্তিনি বাসিন্দাকে সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করা হয়। দেইর ইয়াসিনে ইহুদি মিলিশিয়ারা ১০৭ থেকে ২৫০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে, যাদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ ছিল। এক বছরের মধ্যে গ্রামটি পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও স্লোভাকিয়া থেকে আসা ইহুদি অভিবাসীদের দ্বারা পুনর্বাসিত হয়।
মুসলিম কবরস্থান বুলডোজার দিয়ে মুছে ফেলা হয় এবং “দেইর ইয়াসিন” নামটি মানচিত্র থেকে মুছে যায়। আজ সেখানে কফার শাউল মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র দাঁড়িয়ে আছে। দেইর ইয়াসিন হয়ে যায় কফার শাউল। আল-মুজায়দিল হয়ে যায় মিগদাল হা-এমেক। কালুনিয়া হয়ে যায় মেভাসেরেত জিয়ন।
১৯৪৮ সালের যুদ্ধে ৪শ’থেকে ৬শ’ ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস বা জনশূন্য করা হয়েছিল, অধিকাংশই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে এবং তাদের নামের জায়গায় হিব্রু নাম বসানো হয়।
ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই প্রক্রিয়ার গতি এবং অদৃশ্যতা। গুগল একসময় বিতর্কের জন্ম দেয় যখন তাদের মানচিত্র থেকে পশ্চিম তীর ও গাজা স্ট্রিপের নাম হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। কোম্পানি এটিকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বলে দাবি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক আপডেটগুলোতে দেখা যায় পশ্চিম তীরের এরিয়া সি স্পষ্টভাবে দেখানো হয় না, অথচ ইসরায়েলি বসতিগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রদর্শিত হয়। এমন এক “ত্রুটি” যা সবসময় এক দিকেই কাজ করে। এমন এক অনুপস্থিতি যা সবসময় একটি পক্ষের ভূখণ্ডগত দাবিকে শক্তিশালী করে।
কোয়েটের “ডিজিটাল উপনিবেশবাদ” ধারণাটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধু ইন্টারফেস নয়, পুরো কাঠামোকে দেখতে বলে—কে সিস্টেমটি ডিজাইন করেছে, কে আপডেট নিয়ন্ত্রণ করে, কে সিদ্ধান্ত নেয় কোন তথ্যকে বৈধ ধরা হবে। ঐতিহ্যগত উপনিবেশবাদের সময় ইউরোপীয়রা বন্দর, জলপথ ও রেলপথের মতো অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর গ্রামগুলোকে পাশ কাটিয়ে বাণিজ্য ও সামরিক কেন্দ্রগুলোকে সংযুক্ত করত। এই মানচিত্র প্ল্যাটফর্মগুলোও একই কাজ করে—কিছু জায়গাকে বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করে, আর অন্যগুলোকে অদৃশ্য করে দেয়।
কষ্টের প্রদর্শনী: দখলদারিত্ব যখন দৃশ্যমান নাটকে পরিণত হয়:
ফিলিস্তিনি নাকাব অঞ্চলের বাসিন্দা বাসমা আবু-কোয়াইদার ২০১৮ সালে লিখেছিলেন, “গুগল ম্যাপস আমাদের গ্রামগুলোর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে, ঠিক যেমন ইসরায়েলি সরকার করে। গুগল আমাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে, আর যদি আপনি মানচিত্রে না থাকেন, তার মানে আপনি অদৃশ্য এবং সেটাই ইসরায়েল চায়।”
“গ্রেটার ইসরায়েল” ধারণাটি শুধু দখলদার অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না, এটি এমন একটি ভূগোল চায় যা তার দাবিগুলোকে আগে থেকেই বাস্তব হিসেবে তুলে ধরে। গ্রামগুলোকে অদৃশ্য করে তোলার মাধ্যমে সেগুলোকে দখলের জন্য প্রস্তুত করা হয়—আর ডিজিটাল মানচিত্রগুলো এই কাজের উপযুক্ত হাতিয়ার।
অ্যাপল ম্যাপসে লেবাননের অনুপস্থিত গ্রাম এবং গুগল ম্যাপসে ফিলিস্তিনের অনুপস্থিত গ্রাম—এই দুটোই একই প্রকল্পের অংশ, যা ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন উপায়ে এগিয়ে চলেছে।
সাফুরিয়্যা, লিফতা, দেইর ইয়াসিন, আল-কাবরি, কুওয়াইকাত, আল-বাস্সা : এসব একটি গ্রামের নাম উচ্চারণ করা মানে মুছে ফেলার আগেই সেই মুছে ফেলার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। নাম কোনো প্রতীক নয়। এটি নিজেই বাস্তবতা। এটি সেই রেকর্ড যে, একটি জনগোষ্ঠী এখানে ছিল, তারা নির্মাণ করেছে, তারা তাদের মৃতদের সমাধিস্থ করেছে, তারা জলপাই চাষ করেছে, তারা এখানে বাস করত। কোনো ডাটাবেস আপডেট এই সত্য মুছে ফেলতে পারে না। -জওয়ান জ্রেইক, লেখক একজন জর্ডান-ভিত্তিক ফিলিস্তিনি লেখিকা। তাঁর ডিজিটাল প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টে পটভূমি রয়েছে, এবং তাঁর লেখালেখি পরিচয় ও ভাষার আন্তঃসম্পর্ককে অনুসন্ধান করে, যা উপনিবেশবিরোধী পুনর্দখলের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতার বিভিন্ন কাঠামোকেও বিশ্লেষণ করেন।

[এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং দা সানরাইজ টুডে‘র সম্পাদকীয় নীতির সাথে তা প্রতিফলিত হয় না।]

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button