মেয়েরা কেন পুরুষদের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে

আখতার হামিদ খান: সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ডাবল ডিমের মামলেট’টা কে খায়? দাদা না বৌদি। উত্তরটা খুব সোজা। খুব সম্ভবত দাদাই খায়। বাড়ির কাজের মেয়েটাও বোধহয় এটা দেখেই অভ্যস্ত। পুরুষরা ডাবল ডিমের মামলেট খাবে, মাছের মুড়োটা খাবে, খাবে মুরগীর রানটা-এটাই স্বাভাবিক। এতে কোনো লিখিত নির্দেশ নেই। কিন্তু বাঙালী পরিবারে এ নিয়ম চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। স্বামীকে ছানা মাখন খাওয়িয়েই বাঙালী মেয়েরা কৃতার্থ। এদের জন্মই যেন শুধু অন্যের খাওয়া দেখার জন্য। সম্মত তৃপ্তি দর্শনে- ভোগে নয়। স্বামী যোগ্যতার দিক দিয়ে স্ত্রীর চেয়ে কম হলেও এ নিয়ম প্রযোজ্য। কাজের মেয়েটি মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করে বলে ওঠে- “মাছের মাথাটা দিদিমণি আইজকা আপনে খান। দাদাবাবু রুজই খায়। আপনেও চাকরি করেন, হ্যাও চাকরি করে। ভালোমন্দ খালি কি দাদাবাবুই খাইবো নাকি? আপনের শখ লয় না।” দিদি মণি রেগে বলেন-“উহ ওগুলোতো পুরুষের খাবার, আমার জন্য মাছের লেজ।” এ অবস্থাটা মোটামুটি সব বাড়ির রান্নাঘরেই দেখা যায়। কিন্তু কখনও বলে না যে ভালো জিনিষটা আমার পাতে দাও। মেয়েরা আপসেই এটা দেয়। পুরুষদের কিন্তু এতে আনন্দ পাওয়ার কিছুই নেই। ডালের মজা তলে। একটু গভীরে যান দেখবেন মেয়েরা পুরুষদের সর্বনাশ করছে। ডাবল ডিমের মামলেট খাচ্ছেন, মুরগীর রান খাচ্ছেন, দুধের সর খাচ্ছেন, মাছের মুড়োটা মুখে নিয়ে দিব্যি আরামে কচকচ করে খাচ্ছেন। কচকচ করে যতোই রান আর মুড়ো গিলছেন, ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে ততোই আয়ু কাটা যাচ্ছে। আস্তে আস্তে ভুড়িটা বাড়ছে, হৃৎপিন্ডের শিরার ছিদ্র ক্রমশ ছোট হচ্ছে, ধমনীর ভেতর কোলেস্ট্রলের রেললাইন হচ্ছে। ক’দিন পরে ডায়াবেটিস জাঁকিয়ে বসবে ভুঁড়ির ওপর। লাভটা কার হলো। একদিন ছুটির ঘণ্টার মতো ঘণ্টা বাজবে। মেয়েরা পুরুষদের বেশি খাওয়ালো কিন্তু ক্ষতিটাও হলো পুরুষের। আপনার স্ত্রীর দিকে একবার তাকান। ডায়েটিং আর কাকে বলে। বৌকে নিয়ে বাইরে বেরুবেন। আপনার চল্লিশোর্ধ্ব বৌ দেহের আটসাঁটে পঁচিশেরও কম। নিউমার্কেটে যাবেন। কোনো যুবতী মেয়ে আপনার দিকে ফিরেও তাকাবে না। আপনার বেমানান ভুঁড়ি তাদের বমনেচ্ছা জাগ্রত করবে। কিন্তু রাস্তার পুরুষরা স্থির দৃষ্টিতে আপনার স্ত্রীর অবয়বে চেয়ে থাকবে। সব দোষ বেশি খাওয়াব। যদি এটুকুতেই এ শাস্তি সীমাবদ্ধ থাকতো। তবেও হতো। আয়ুও তো কমে যাচ্ছে। অনেক পরিসংখ্যানের এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে কম বাঁচে-কারণটি কি? শুধু কি বেশি খাওয়া। না আরো অনেক কিছু।

একটা গোলাপ আর নারীর মধ্যে পার্থক্যটা কি? পার্থক্য খুব কম। গোলাপও সৌন্দর্যের আঁধার নারীও। এই পৃথিবী যে এতো সুন্দর, এতো বৈচিত্র্যময় তার একক কৃতিত্ব প্রকৃতির নয়, নারীরও। গোলাপ চারদিকে বিলিয়ে দেয় গন্ধ আর নারী তার রূপ। গন্ধ আর রূপের অপূর্ব সমন্বয় গোলাপ আর নারী। আরেকটা ক্ষেত্রে নারী ও গোলাপের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। প্রাকৃতিক বৈপরীত্যের মধ্যে উভয়েই বাঁচে অনেক দিন। এ পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর তার সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী হবে এ ধারণাটা সব ক্ষেত্রে ঠিক নয়। যেমন ঠিক নয় নারী কিংবা গোলাপের বেলায়। মেয়েদের জীবন মোটেই তো ক্ষণস্থায়ী নয় বরং দীর্ঘস্থায়ী। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই সব পুরুষদের জন্য একটা দীর্ঘশ্বাস। তবে বিজ্ঞানতো আপাতত সে কথাই বলে। সব কথার শেষ কথা মেয়েরা তবে বাঁচে দীর্ঘদিন!
কেন এমন হয়?

বিশ্ব পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে যে, পুরুষের তুলনায় মেয়েদের গড় আয়ু ৩ থেকে ৪ বছর বেশি। এতে অবশ্য পুরুষদের ঈর্ষাপরায়ণ হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। এ নিয়ম আজকের নয়। যুগ-যুগ ধরে এ নিয়ম পৃথিবীতে বিদ্যমান। ঘটনার একটু গভীরে প্রবেশ করলেই এ-ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হবে। শুধু মানুষ কেন, শামুক, পোকা মাঁকড়, মাকড়সা, পাখি, সাপ কিংবা স্তন্যপায়ী প্রাণী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্ত্রী জাতি পুরুষ অপেক্ষা বেশি দিন বাঁচে। শতাব্দী থেকে শতাব্দী এ নিয়ম চলে আসছে। খুব সম্ভবত পুরুষ লিংগের আগেভাগে মৃত্যুবরণ করার ঘটনা বিশ্বজনীন কোনো জৈব প্রক্রিয়া আমাদের চারপাশে এই যে হাজারো রকমের পরজীবী জীবাণু, এদের মধ্যেও স্ত্রীরা বেশি দিন বাঁচে। হতে পারে এটা প্রকৃতির একটা অদ্ভুত খেয়াল। যদি মশা ও মৌমাছির কথায় আসা যায় তবে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হবে। মেয়ে মশা আর মৌ-রাণী দীর্ঘজীবী। কিন্তু পুরুষের জীবন একেবারেই নগণ্য। পৃথিবীতে এমন কিছু প্রাণী কিংবা সরীসৃপ জাতীয় প্রজাতি আছে যেখানে পুরুষরা মেয়েদের সাথে সহবাস করার পর পরই মৃত্যুবরণ করে। রমণের আনন্দ না যেতে-যেতেই মৃত্যুর সমন এসে হাজির হয়। কিন্তু মানুষের বেলায় ব্যাপারটা এতো হৃদয়বিদারক নয়।
প্রকৃতি কেন নারী পুরুষ সৃষ্টি করলো? লিঙ্গ পার্থক্য করার বিশেষত্ব কোথায়। এক কথায় এর উত্তর হ’তে পারে বংশধারা নিশ্চিত করার জন্য। বাহ্যিক দিক দিয়ে পুরুষকে নারী থেকে অনেক শক্তিশালী মনে হলেও প্রকৃতির কাছে তা উল্টো। এক সময় ভাবা হতো মেয়েরা জেনেটিক্যালি দুর্বল। তাদের জেনোটাই দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার জন্য উপযোগী নয়। কিন্তু এখনকার বিজ্ঞানীরা এটা মানতে নারাজ। মেয়েদের জেনোটাইপ মোটেই দুর্বল নয় বরং পুরুষের প্ররোচনায় মেয়েরা জেনোটাইপিক্যালি (বাহ্যিক রূপ) দুর্বল। শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে পুরুষ জাতি নারীর ওপর কর্তৃত্ব করে আসছে। এই ব্যাপারটা নারীকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। একজন মেয়ে শিশু যখন প্রতিদিন দেখে যে একজন ছেলে তার নিরাপত্তা তখন সে আস্তে-আস্তে দুর্বল হয়ে পড়ে। মেয়েদের যাবতীয় দুর্বলতা পুরুষসৃষ্ট। এটাই পুরুষের সান্ত¦না। কিন্তু প্রকৃতিতে এর উল্টো প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার সামর্থ্য মেয়েদের বেশি মেয়েদের রয়েছে অনুকূল ভাবে প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার বিস্তৃত পরিধি এবং তা বংশগতভাবে অর্জিত। উদাহরণস্বরূপ ধরা যায় ঠান্ডা জলবায়ু সহনশীলতা। এ ক্ষেত্রে মেয়েরা পুরুষের তুলনায় শক্ত। স্ত্রীর শরীরের বাইরের দিককার চর্বির আবরণ পুরুষের তুলনায় পুরো। একজন সমবয়সী পুরুষ অপেক্ষা একজন মেয়ের শরীরে ফ্যাট সেল বা চর্বির কোষের পরিমাণ সহজেই মানিয়ে নেয় কিন্তু পুরুষ তা পারে না। প্রাকৃতিক চরম অবস্থায় পুরুষের তুলনায় মেয়েদের টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা ঢ়ের বেশি। এতো গেলো মাত্র একটা উদাহরণ। রোগ-শোক সব কিছুতেই নারীর সহনশীলতা পুরুষের তুলনায় বেশি। তাই এ সব থেকে মনে হয় নারীকেই পুরুষসমাজকে শাসন করা উচিত ছিলো। কিন্তু এখনও তা ঘটেনি। পুরুষ নারীকে জন্মের পর পরই মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। পারিপার্শ্বিকতা এতে প্রভাব ফেলে। এটাই পুরুষ কর্তৃক নারী শাসনের প্রধান কারণ। তবে এ শতাব্দীর শেষেিদক এ নিয়ম বহাল থাকবে কিনা তাতে অনেক সন্দেহ রয়েছে। এবার যদি পরিবেশের প্রভাব থেকে একটু অন্যদিকে মুখ ফিরাই তবে কি বেশি। বুদ্ধিমত্তায় কি মেয়েরা পুরুষের চেয়ে কম? কখনো না। মাদাম কুরী, মাদাম তেরেসা, ইন্দিরা গান্ধী, মার্গারেট থ্যাচার কিংবা বেগম রোকেয়ারা প্রমাণ করেন যে মেয়েরা কোনোদিক দিয়েই ছেলেদের চেয়ে কম নয়। বাকি রইলো শক্তিসামর্থ্য। এতে এখনো পুরুষ এগিয়ে। এটা পুরুষের এক ধরনের কূটনীতি। গত অলিম্পিকে ফ্লোরেন্স গ্রিফিথ জয়নার যে সময়ে একশ’ মিটার দৌড়িয়েছে সে সময়ে কিন্তু বাংলাদেশের কোনো পুরুষ এথলেটও দৌড়ায়নি। তাই মেয়েদের শক্তি ও সামর্থ্য নেই এই অলীক কথা টিকে না। মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে কম শক্তিবান এ দোষ মেয়েদে নয়জ্জএ দোষ সিষ্টেমের। আমাদের দেশের সখিনা বিবি, কুলসুম বেগম কিংবা শান্তিবালাকে যদি তার যোগ্যতা প্রদর্শনের সুযোগ দেয়া হতো তবে তার জয়নারের মতো পুরুষদের আগে না ছুটতে পারেতো তবে তাদের সাথে কিংবা কাছাকাছি পৌঁছতে পারতো এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকা উচিত নয়। জীবনের সকল ক্ষেত্রে পুরুষ নারী উনিশ বিশ। কেউ এদিকে একটু বেশি হলে ওদিকে একটু কম। কিন্তু আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের মধ্যে ফারাক আকাশপাতার। এই অবস্থাটা যতো তাড়াতাড়ি দূর হয় ততোই ভালো।

এবার আবার সেই পুরোনো কথা-আয়ূ বা লংজিবিটি নিয়ে। এদিক দিয়ে নিঃসন্দেহে মেয়েরা একটু এগিয়ে। মেয়েরা যে ছেলেদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচে এটা একটা প্যারাডক্স। এর উল্টোটা হওয়া উচিতজ্জকিন্তু হয় না। এ পৃথিবীতে যে আগে আসবে সে আগে মারা যাবে এটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিত, কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা ঘটে না। এই ব্যতিক্রমগুলো মাতৃগর্ভ থেকে শুরু হয়। মাতৃগর্ভে বালক শিশুর গড় জীবনকাল বালিকা শিশুর গড় জীবনকাল থেকে বেশি এবং বালিকা শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে সে তখন সমবয়সী বালক শিশুর চেয়ে প্রায় মাসখানেক বেশি পূর্ণতার পরিচয় দেয়। জন্মের পর বালক ও বাণিকা শিশুর মধ্যকার এই পার্থক্য আরো বিস্তৃত হয়। বালিকা শিশু বালকের চেয়ে দু’ থেকে তিন মাস আগেই হাঁটবে এবং চার থেকে পাঁচ মাস আগে কথা বলতে শেখে। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের যৌবন প্রাপ্তিও ঘটে আগে। বয়ঃসন্ধির তারতম্যও ২ থেকে ৪ বছর। মেয়েদের সেক্সসাইকেল শেষ হয় গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ বছরের ভেতরে। হাড়ের পূর্ণতার কথা বিবেচেনা করলেও সেই একই সত্যটি বেরিয়ে আসে। মেয়েদের শরীরের পূর্ণতা ছেলেদের তুলনায় আগে হয়। অর্থাৎ নারীর বৃদ্ধি, বিকাশ, প্রাপ্ত বয়স্কতা অর্জন, সব কিছুই হয় ছেলেদের আগে, তাই যুক্তিগতভাবে তাদের আয়ু ছেলেদের তুলনায় কম হওয়া উচিত। কিন্তু পরিলক্ষিত হচ্ছে এর উল্টোটি। আগে আসলে আগে যেতে হবে এ যুক্তিটি মেয়েদের আয়ুর বেলায় প্রযোজ্য নয়। বরং ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি বাঁচে। বাস্তবিক পক্ষেই এটা একটা প্যারাডক্স।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...

Close
Close