নেতৃত্বহীন দেড়শ’ কোটি মুসলমান

Muslimইলিয়াস হোসেন:
সারা বিশ্বেই মুসলমানরা মারা যাচ্ছে। কেউ মরছে আগ্রাসী শক্তির হাতে, কেউ স্বৈরশাসকদের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে মারা যাচ্ছে আরো বেশি মুসলমান। অনাহার, দারিদ্র্যের কারণেও অকালেই ঝরে যাচ্ছে বহু মুসলমানের জীবন।
কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই। এসব বন্ধে নেই কোনো যোগ্য নেতৃত্বও। বস্তুত বিশ্বের ১৬০ কোটি মুসলমান আজ নেতৃত্বাহীন।
নেতা হয়ে যারা দেশ শাসন করছেন তাদের বেশিরভাগই স্বৈরাচার, অপদার্থ, দুর্নীতিবাজ ও পাশ্চাত্যের পদলেহী, সর্বোপরি মুসলমান নামধারী মাত্র। ইসলামী চেতনা বড়জোর তাদের প্রাসাদের দেয়ালের শোভা বর্ধন করে, নিজেদের জীবনধারায় মহান এই ধর্মের কোনো প্রতিফলন ও চর্চা নেই।
বেশিরভাগই মুসলিম দেশের শাসকই জনগণের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছেন। তাদের পেছনে জনগণের কোনো ম্যান্ডেট নেই। মুসলিম বিশ্বের মুরব্বি সৌদি আরবের ক্ষেত্রে একথা যেমন সত্য, তেমনি সত্য বাংলাদেশসহ বেশিরভাগ দেশের ক্ষেত্রেই।
মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রচর্চার অভাব বড়ই প্রকট। কোনো কোনো দেশে সংবিধানে গণতন্ত্রের কথা লেখা থাকলে বাস্তবে তার কোনো রূপায়ণ নেই।
এই যখন মুসলিম বিশ্বের শাসকদের অবস্থা তখন তাদের জনগণের উন্নতির আশা করা বাতুলতা বৈকি।
উন্নতি তো পরে, আগে দরকার বেঁচে থাকা। সেটাই এখন মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে দুশ্চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুসলমানদের জীবন এখন পৃথিবীর সবচেয়ে কম দামি বস্তু। বিশ্বের সর্বত্র প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মুসলমান যুদ্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতাসহ নানা মানবসৃষ্ট কারণ মারা যায়। অথচ মুসলিম বিশ্ব নীরব। জনগণেরও এসব মৃত্যু গা সওয়া হয়ে গিয়েছে।
ফিলিস্তিনে ইহুদিদের হাতে মারা যাচ্ছেন অসহায় নারী-পুরুষ-শিশু। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে মুসলমানদের রক্তস্রোত থামছেই না। ইরাকের মুসলমানরা মরে রাস্তায় পড়ে থাকছে। সিরিয়ায় হাজার হাজার মানুষ প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ক্ষমতার বলি হয়েছেন, হচ্ছেন। সুদান, মালি, নাইজেরিয়া, মিসর, লিবিয়ায় মুসলামদের জীবন যেন খেলনায় পরিণত হয়েছে। বসনিয়া ও চেচনিয়ায় মুসলমানদের অকাতরে জীবন দিতে হচ্ছে।
অথচ এসব বন্ধে মুসলিম দেশগুলোর নেতারা নির্বিকার। গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার নিন্দা জানানোরও সাহস দেখাতে পারেনি বেশিরভাগ মুসলিম প্রধান দেশের শাসকরা।
এর কারণও আছে। বর্তমানে বেশিরভাগ মুসলিম শাসকদের হাতই তাদের জনগণের রক্তে রঞ্জিত। জনগণের কল্যাণসাধন তাদের উদ্দেশ্য নয়। তাদের অহর্নিশ কাটে ক্ষমতা দখল ও ধরে রাখার ফন্দিফিকিরে।
মুসলিম বিশ্বের বেশিরভাগ শাসকই জনগণের ওপর চেপে বসেছেন। কোনো কোনো দেশে নামবর্সস্ব গণতন্ত্র থাকলেও নির্বাচনের প্রতি অনাস্থা সংকটকে আরো গভীরতর করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম প্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়ায় সমপ্রতি তুলনামূলক একটি ভালো নির্বাচন হলেও ক্ষমতালিপ্সুদের জন্য তাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। পাকিস্তানের নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন আছে, মালদ্বীপে নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচনকে তামাসায় পরিণত করা হয়েছে। মালয়েশিয়া, তিউনিশিয়া, ইরান, নাইজেরিয়ায় নির্বাচনী ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র নিয়ে সংকট আছে।
অমুসলিম বিশ্বেও মুসলমানরা মার খাচ্ছে। চীনের জিনজিয়াং, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ, ফিলিপাইনের মিন্দানাও, মিয়ানমারের রাখাইন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু মুসলমানদের জীবনে এখন ঘোর অন্ধকার।
অথচ মুসলমানদের জন্য কথা বলার মতো বলতে গেলে কেউ নেই। মুসলমানদের পবিত্রতম স্থান মক্কা ও মদিনা শাসনকারী সৌদি আরবের রাজতান্ত্রিক শাসকদের গদি এখন টলটলায়মান। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে আছেন বাদশা আবদুল্লাহ। আগে বিভিন্ন মুসলিম দেশের সংকটে মাঝে মাঝে তিনি ভূমিকা রাখতেন। এখন হাঁটছেন তার উল্টোপথে। নিজের বংশানুক্রমিক শাসনকে টিকিয়ে রাখতে মিশর ও ফিলিস্তিনের গণহত্যার পক্ষ নিয়েছেন তিনি।
মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহাথির মোহাম্মদ একজন আধা স্বৈরশাসক হলেও মুসলিম বিশ্বের ইস্যুতে কথা বলতেন। তার দেশ এখন শাসন করছেন কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা একজন প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমানে মুসলমানদের পক্ষে কথা বলেন একমাত্র তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। তার বিরুদ্ধে সৌদি আরব, ইসরাইল, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত একাট্টা।
এ অবস্থা চললে ভবিষ্যতে মুসলমানদের ব্যাপারে কোনো নেতাই হয়তো কথা বলতে সাহসী হবেন না।
এরদোগান নিজের দেশের সমস্যার সমাধান করেছেন, বিশ্বসভায় দেশকে মহীয়ান করেছেন। কিন্তু এক এরদোগান দিয়েই তো আর অর্ধশত মুসলিম বিশ্বের সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার আরও অর্ধশত এরদোগান।
কিন্তু তেমন কোনো সম্ভাবনা বা সুযোগ নেই। অর্থব মুসলিম নেতাদের শাসন এতোটাই ভয়ঙ্কর যে কোনো এরদোগান তৈরি হতে দিতেও তারা প্রস্তুত নয়। মালয়েশিয়ার আনোয়ার ইব্রাহিম এর বড় প্রমাণ। বিচারের নামে ওই দেশের সরকার তার ওপর কী অবিচারটাই না করে চলেছে।
এ অবস্থায় মুসলিম বিশ্ব আজ নেতৃত্বহীন। তাদের সামনে ঘোর অমানিশা।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button