পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদগুলোর একটি বাংলাদেশে

৬৯ হিজরিতে নির্মিত একটি মসজিদের প্রমাণ পাওয়া গেছে লালমনিরহাটে। এতে ধারণা করা হচ্ছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবনকালেই বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার শুরু হয়েছিল। লালমনিরহাটে আনুমানিক ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম ইসলামের আবির্ভাব ঘটার প্রমাণ মিলেছে এ সংক্রান্ত গবেষণার মাধ্যমে।

জেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস গ্রামের ‘মজেদের আড়া’ নামক জঙ্গলে ১৯৮৭ সালে আবিষ্কৃত হয় প্রাচীন একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ। জঙ্গলটি খনন করে মসজিদের অনেক ইট পাওয়া যায়। যার মধ্যে একটিতে কলেমা তাইয়েবা ও হিজরি সন লেখা পাওয়া যায়। সেখানে একটি মসজিদ পুনর্নির্মাণ করা হয়।

২০১২ সালের ১৭ আগস্ট এ নিয়ে আলজাজিরা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে একজন অপেশাদার প্রত্নতত্ত্ববিদ টিম স্টিল সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছে। এই প্রত্নতত্ত্ববিদ আলজাজিরার প্রতিবেদক নিকোলাস হককে উদ্ধারকৃত ইটটি দেখিয়ে এটি কোন সময়কার তা ব্যাখ্যা করেন।

প্রাথমিকভাবে গ্রামবাসী সে জায়গাটিতে খননকালে অনেক ইটের সন্ধান পান যেখানে একটিতে কলেমা ও হিজরি সন উল্লেখ রয়েছে। এর ওপর প্রত্নতত্ত্ববিদ টিম স্টিল গবেষণা করে এটাকে একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে চিহ্নিত করে। অনুসন্ধানে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় নির্মিত প্রাচীনতম মসজিদ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।

উদ্ধারকৃত ইটে কালেমা তাইয়েবা ও ৬৯ হিজরি লেখার অর্থ হলো হিজরি ৬৯ সালে অর্থাৎ ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে এটি নির্মিত হয়েছিল। ‘রংপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রাসূল (সা) এর মা ও বিবি আমেনার চাচাতো ভাই আবু ওয়াক্কাস রা: ৬২০-৬২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেন (পৃ: ১২৬)।

অনেকে অনুমান করেন যে, আবু ওয়াক্কাস (রা) এর অনুপ্রেরণায় ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ হয়। বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ও প্রাচীন এই মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ২১ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১০ ফুট। মসজিদের ভেতরের পুরুত্ব সাড়ে চার ফুট। মসজিদে চার কোণে অষ্টকোণ বিশিষ্ট স্তম্ভ রয়েছে। মসজিদের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া যায় গম্বুজ ও মিনারের চূড়া (রংপুর জেলার ইতিহাস, পৃ: ১৬৪)।

মতিউর রহমান বসনীয়া রচিত ‘রংপুরে দ্বীনি দাওয়াত’ গ্রন্থেও এ মসজিদের বিশদ বিবরণ রয়েছে। লালমনিরহাটের এ প্রাচীন মসজিদ ও এর শিলালিপি দেখে বলা যায় যে, বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের (১২০৪ খ্রি:) ৬০০ বছর আগেই বাংলা অঞ্চলে সাহাবি রা:-এর মাধ্যমে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল।

আরবী হরফে লেখা মৃত্তিকা-ফলকটিতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সঃ)’ ও নীচের সারিতে ৬৯ সংখ্যাটি বোঝা যায়। এর থেকে ধারনা করা হয় যে, রাসুল সা. এর ওফাতের প্রায় অর্ধ-শতক বছর পরই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রত্ন-তাত্বিক গবেষণার অভাবে মসজিদের প্রাচীনত্ব নিরূপন করা সম্ভবপর হয়নি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ঐ সময় এই সব এলাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচারক বা পীর-দরবেশ-আউলিয়াদের আগমনের তথ্য মেলে না।

আবার, ১২০৪/৫ খ্রীঃ তুর্কী বংশোদ্ভুত মালিক-উল-গাজী ইখতিয়ার-উদ-দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী নদীয়ায় সেন রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করার আগে বাংলায় মুসলিম শাসন কায়েম করা সম্ভব হয়নি– এমনটাই আমরা জানি। অর্থাৎ তৎপরবর্তী সময়ে এখানে মুসলমান কর্তৃক ইসলাম প্রচারের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত হয়। তাহলে, প্রচলিত ধারণার আরো ৬০০ বছর আগে কি বাংলায় ইসলামের সুমহান বানী পৌঁছেছিল?

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button