বসনিয়ায় মুসলিম হত্যাযজ্ঞ ও এবারের নির্বাচন

মো: বজলুর রশীদ: বসনিয়া পাহাড়ঘেরা নৈসর্গিক শোভায় ভরপুর একটি দেশ। বসনিয়ায় রয়েছে দৃষ্টিনন্দন মসজিদের মিনার, বাইজেনটাইন আমলের গম্বুজ ও ক্যাথলিক চার্চ। রাজধানী সারাজেভোকে ‘বলকানের মুক্তা’ বলা হয় এবং বসনিয়া হারজেগোভিনাও বলকানের অপূর্ব সুন্দর দেশ। ইউরোপের মাঝখানে অবস্থিত এই অঞ্চল একসময় ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঐতিহাসিক বাসকারসিজা বাজার সারাজেভোর মাঝখানে অবস্থিত। ‘গ্রান্ড বাজার’ হিসেবেও এর সুখ্যাতি রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য এটি বিখ্যাত। বসনিয়ান মুসলমানদের পছন্দের খাবার ‘বসনিয়াক বোরেক’, পেস্ট্রি ডিশ, তুর্কি কফি ও তারহানা স্যুপ ইউরোপীয়দের কাছে খুবই জনপ্রিয়। ৪১৫ বছর বসনিয়া ওসমানী বা অটোম্যান খেলাফতের অধীন ছিল। ফলে এখানে অনেক আকর্ষণীয় মুসলিম স্থাপত্য, মনোমুগ্ধকর মিনার ও ইসলামি শিল্পকর্ম দেখা যায়। ওসমানী ফেব্রিক্সের জন্য বসনিয়া এখনো প্রসিদ্ধ।

গাজী হুসরেভ বে কমপ্লেক্স, ঐতিহ্যবাহী কুল্লিয়া (সামাজিক ইসলামি কমপ্লেক্স), কিছু হাম্মামখানা, মাদরাসা, সারাজেভো সরাইখানা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মোস্তার ব্রিজের ভগ্নাংশ বসনিয়া যুদ্ধের ও ক্রোশিয়ার কামানের গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত বড় এক স্মৃতি। তুরস্ক ১৯৯৪ সালে ব্রিজটি পুনর্নির্মাণ করে দেয়। মোস্তার ব্রিজ অনেক ইতিহাসও অনেক মৃত্যুর সাক্ষী। এই ব্রিজকে নিয়ে বানানো হয়েছে অনেক চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারি। আজ পর্যটকেরা, যাদের সাহস আছে এ ব্রিজ থেকে ২৭ মিটার নিচে প্রবাহিত নেরৎভা নদীতে ঝাঁপ দেন। ব্রিজের উভয় পাশে তৈরি হয়েছে বহু দোকানপাট, বিক্রি হয় স্যুভেনির। মোস্তারকে ২০০৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। একসময় এখানে ১৭টি মসজিদ থাকলেও বর্তমানে মাত্র একটি মসজিদ আছে, হামজা বে মসজিদ। ১৪০৯ সালে নির্মিত। ১৮৭৭ সালে ওসমানী সাম্রাজ্য ও রাশিয়ানদের মধ্যকার যুদ্ধে অনেক মসজিদ পুড়ে যায়, সৃষ্ট জনপদ বুলগেরিয়াও অনেক মসজিদ পুড়িয়ে ধ্বংস করে।

ইউরোপের তিলোত্তমা ও সুন্দর পার্বত্য এলাকা বসনিয়া পর্যটকদের আকৃষ্ট করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ধনীরা অবকাশ কাটাতে আসেন। এখানে জায়গা জমির দাম কম, খাবারও বেশ সস্তা। অনেকে নিজেরাই রিসোর্ট বানিয়ে অবসর সময় কাটান। শুধু আরব আমিরাতই থেকে বছরে ১৫ হাজার লোক ভ্রমণ করতে আসেন। পুরো আরব দেশের টুরিস্ট আসেন বছরে ৫০-৬০ হাজার। সারাজেভো টুরিস্ট বোর্ড এসব তথ্য দিয়েছে। দুঃখের বিষয়, আরবরা বিপুল সংখ্যায় বেড়াতে গেলেও বসনিয়ার মুসলমানদের জন্য কিছু করেছেন, এমন তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না।

১৯৯২ সালের এপ্রিলের ৫ তারিখ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা সংসদ যুগোস্লোভিয়া ফেডারেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। রেফারেন্ডামের ভিত্তিতে সংসদ এমন সিদ্ধান্ত নিলেও বসনিয়ার সার্বরা এর প্রচণ্ড বিরোধিতা করে এবং বেলগ্রেডের সহায়তায় পরদিন, ৬ এপ্রিল মুসলমানদের জাতিগত নিধন শুরু করে দেয়। মুসলমানেরা সভ্য ইউরোপে এমন হবে, তা ভাবতেও পারেনি। তাই তাদের প্রতিরোধের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। এই নির্মূল অভিযান সভ্য ইউরোপে সাড়ে তিন বছর চলতে থাকে। হাজার হাজার মুসলমান নর-নারী হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় এবং ২০ লাখ মুসলমান দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।

বসনিয়া দেশটিতে তিনটি প্রধান নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী রয়েছে। বসনীয় মুসলমান বা বসনিয়াক, ক্রোট ও সার্ব। তিনটি গোষ্ঠী নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। তাই বলতে হয়, বসনিয়ায় আছে তিনটি প্রধান ভাষা। বসনিয়া হারজেগোভিনার জনসংখ্যা ৪০ লাখ। জনগণ মুসলমান ও খ্রিষ্টান। মুসলিম জনসংখ্যার অর্ধেক যেন হাওয়া হয়ে গেছে ওই হত্যাযজ্ঞে। ইউরোপের পণ্ডিতরা এ হত্যাযজ্ঞকে বলেন ‘এথনিক কিনজিং’ নৃতাত্ত্বিক পরিছন্নতা! এই শব্দটির সোজা বাংলা করা উচিত গণহত্যা। সাবেক যুগোস্লাভিয়াতে মার্শাল টিটো সবাইকে একত্র করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ‘তেল ও পানি কখনো মেশে না।’ বসনিয়া যুদ্ধের সময় পশ্চিমা মিডিয়া ছিল ‘প্রপাগান্ডা’র হাতিয়ার। মূলত সেনাবাহিনী এসব পরিচালনা করত। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ক্রোট ও সার্বরা নিয়ন্ত্রণ করত। বসনিয়ার জনসংখ্যার অর্ধেক মুসলমান। ক্রোটরা রোমান ক্যাথলিক। বসনীয় সার্বরা অর্থডক্স চার্চের সাথে সম্পৃক্ত। স্বাধীন রাষ্ট্র বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার দু’টি প্রধান অঞ্চল রয়েছেÑ মুসলিম ও ক্রোট অধ্যুষিত অঞ্চলটির নাম বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ফেডারেশন আর সার্ব অধ্যুষিত অঞ্চলটি সার্বস্কা রিপাবলিকা। সার্বস্কাকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে রাশিয়া ও সার্বিয়া। বসনিয়া ফেডারেশনে মুসলমান ৭২ শতাংশ এবং সার্ব ৩.৪ শতাংশ, রিপাবলিকায় সার্ব ৮২ শতাংশ ও মুসলমান ১৪ শতাংশ, উভয় স্থান মিলে ক্রোটরা সংখ্যালঘু।

সাড়ে তিন বছরের হত্যাকাণ্ডে এক লাখ মানুষ হত্যার শিকার হয়েছিল। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই মুসলমান। ১৯৯৫ সালে সেব্রেনিকসায় বসনীয় সার্বরা আরো আট হাজার মুসলিম পুরুষ ও বালককে হত্যা করে। বলকান যুদ্ধের সময় বসনিয়ার সার্ব বাহিনীর কাছে সেব্রেনিসার পতন ঘটার পর তাদের হত্যা করা হয়। পরিবারের লোকজনের সামনেই আট হাজার মুসলমান বসনীয়কে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের বৃদ্ধ এবং মহিলারা ভয় ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটায় বছরের পর বছর। হত্যাকাণ্ডের পর আরো এক হাজার মুসলমানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বিগত ২৪ বছরেও। তারা কেঁদে কেঁদে বলেছে, ‘আমাকে কেন বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে?’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সেব্রেনিসা হত্যাযজ্ঞই প্রথম হত্যাযজ্ঞ। সবাই মিডিয়ার কল্যাণে ৯/১১ ও বোস্টন বোমা হামলার কথা জানতে পারলেও সেব্রেনিসা হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে খুব কম জানি। তাও পশ্চিমা মিডিয়ার কারণে। বধ্যভূমি থেকে পটোকারিতে পালিয়েছে ২০ হাজার নর-নারী। তা ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশেও তারা দলে দলে পালিয়েছে।

যুদ্ধের পর সার্বদের সাথে একত্রে থাকার ইচ্ছে অনেকের বিনষ্ট হয়ে গেছে। বসনিয়া হারজেগোভিনা যেন প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়ার ক্ষুদ্র সংস্করণ, কারণ বেশ কিছু সার্ব ও ক্রোশিয়ান, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের এলাকায় রয়েছে। যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর এদের হাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মূল্য দিতে হয়েছে বেশি।

যুদ্ধের সময় দীর্ঘ দিন সারাজেভো শহর অবরোধ করে রাখা হয়েছিল। অবর্ণনীয় দুঃসহ অবস্থায় মুসলমানদের দিন কাটে। শুধু অবরোধের কারণে চার হাজার বসনীয় মুসলমান মৃত্যুবরণ করে খাবারের অভাবে। হত্যাকাণ্ডের সময় টিটো স্ট্রিটের একটি পার্কে শিশুরা খেলাধুলা করছিল; কামানের গোলা তাদের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়। পাশেই বাজার, মার্কেট স্কোয়ার, যেখানে বসনীয় মুসলমানরা ফলমূল, রুটি ও গোশতের জন্য জমায়েত হয়, সেখানে ১৯৯৪ সালে বোমা মেরে ৬৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। হাসানোভেচের এ বর্ণনা যিনি এখন একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। ১৯৯২ সালের ৯ মে তার বয়স ছিল ছয় বছর। তিনি এ ঘটনার ওপর প্রামাণ্যচিত্র করছেন। তিনি আরো জানান, সার্বরা গ্রামে এসে ৭৪ জন পুরুষকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। ঘোষণা দেয়া আছে, সেব্রেনিসা পার্বত্য এলাকা জাতিসঙ্গ ঘোষিত নিরাপদ এলাকা, অথচ সার্বরা সেখানেই হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সবাইকে শেষ করে দিয়েছিল।

সার্বিয়ার নিস শহরে রাশিয়ার একটি কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিয়েছে হত্যাকারীরা। এর অর্থ হচ্ছে সার্বিয়া ও রাশিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছে সার্ব সেনাদের কিলিং ফোর্স। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ায় যুদ্ধাবসানের ডেটন চুক্তির অধীনে সার্বস্কা রিপাবলিকা অঞ্চলটিকে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সার্ব অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সার্বস্কা রিপাবলিকার প্রেসিডেন্ট ও বসনিয়ান সার্ব ন্যাশনালিস্ট পার্টির নেতা মিলোরাড দোদিক এ বাহিনী তৈরি করেছেন। আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা রাশিয়া ও সার্বিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে। কিছু সদস্য ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীদের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধও করেছে। আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অনেকেই অপরাধের সাথে জড়িত। এখন আশঙ্কা করা কঠিন নয় যে, আবারো মুসলিমদের হত্যা করে আরেক সেব্রেনিসা হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয় কি না কে জানে। মিলোরাদ দোদিক ও তার অনুসারীদের সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া। এই অক্টোবরে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় অনুষ্ঠিত হলো সাধারণ নির্বাচন। বসনিয়ানদের মধ্যে ক্ষোভ আছে ক্রিমিয়া ও দক্ষিণ অসেশিয়ায় রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন নিয়ে। বিদেশী হস্তক্ষেপ দেশটিকে আবারো অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

সার্বস্কা রিপাবলিকার প্রেসিডেন্ট দোদিক মুসলমানদের প্রতি মোটেই বন্ধুভাবাপন্ন নন। আজানের শব্দকে তিনি ‘গর্জন’ বলে টিভি শোতে মন্তব্য করেছেন। তার এ ইসলামোফোবিক মন্তব্য পশ্চিমা গণমাধ্যমে তেমন প্রচার পায়নি। এসব মন্তব্য ডেটন খেলাফ হলেও কারো মাথাব্যথা নেই। বিশেষ করে মানবাধিকার কর্মীরা চুপচাপ। দোদিক বলেন, ‘এত বেশি মসজিদ থাকার কী প্রয়োজন’। বসনিয়ার মুসলমানেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী সেখানে বসবাস করে আসছে। বাস্তুচ্যুতরা ফিরে এসে সেখানে বসবাস করতে চায়। এই মাটিই তাদের জন্মস্থান। এখানকার আলো-বাতাসে বড় হয়েছে মুসলমানেরা। আর এখানেই সার্বরা বলকান যুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধ করেছে, বিশেষ করে সেব্রেনিনা গণহত্যা ইতিহাসে কুখ্যাত হয়েই আছে। যুদ্ধাপরাধী রাদোভোন কারাজিক, স্লাদিক বা বিলজানা প্লেভসিকের মতোই একজন যুদ্ধাপরাধী হলেন দোদিক। তথাপি তাকে ‘মধ্যপন্থী’ একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বহুজাতিক প্রেসিডেন্সির একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি জিতেছেন। এই সার্ব আইনজীবীকে একসময় বসনিয়া থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল এবং ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনেছে। অথচ চলতি অক্টোবর নির্বাচনে তিনিই জিতলেন। নির্বাচনে জয়লাভ করেই ঘোষণা দিলেন ‘বসনিয়ার উচিত ক্রোশিয়াকে রাশিয়ার অংশ বলে বিবেচনা করা।’ বসনিয়া মুসলমানদের অবস্থা কেমন হবে তা বর্তমান অবস্থা দেখেই বোঝা যায়।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় গত ৭ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচন হয়। বসনিয়া কি বহুজাতির ঐক্যবদ্ধ একটি দেশ হিসেবে বহাল থাকবে, নাকি জাতিসত্তার ভিত্তিতে টুকরো টুকরো হয়ে যাবেÑ সেটাই এখন প্রশ্ন। বসনিয়া বিভক্তি ও সঙ্ঘাতে লিপ্ত থাকবে নাকি ঐক্যবদ্ধ থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য হওয়ার দিকে অগ্রসর হবে, তারও পরীক্ষা এখন। জনগণ নির্বাচনে বহুধা বিভক্ত। ৫৩টি দল, ৩৬টি কোয়ালিশন ও ৩৪ জন নির্দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করেছে। মোট ৫১৮টি পদের জন্য ৭০০০ প্রার্থী প্রতিযোগিতা করেছেন। দোদিক প্রেসিডেন্সিতে নির্বাচিত হওয়ায় মুসলমানেরা খুবই শঙ্কিত। তবে আরো দুজনসহ তিনজনের প্রেসিডেন্সি দেশ শাসন করে। বলতে হয় দেশ পরিচালনা পদ্ধতির জটিলতা ও নৃতাত্ত্বিক বিভেদ, বিচ্ছিন্নতা ও বিরোধকে উসকে দিচ্ছে বারবার।

ডেটন চুক্তি অনুসারে সার্ব কর্তৃপক্ষ বসনিয়াকদের নিরাপদে নিজ বাসস্থানে ফিরিয়ে আনার কথা, বাস্তবে তাদের ফিরিয়ে না এনে বরং ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। যারা ফিরে এসেছে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এ ভয়ে, যে কখন না আবার কোন বিপদ নেমে আসে। আমির সুলজাজিক একটি বই লিখেছেন, ‘কবর থেকে লেখা এক পোস্টকার্ড’। সেখানে তিনি বলেছেন, সার্বদের এখনকার তর্জন গর্জন গণহত্যার সময়ের গর্জনের মতোই। যুদ্ধাপরাধী বিলজানা প্লেভসিক বলেন, ‘মুসলমানেরা জেনেটিক ওয়াস্ট’। দোদিক বারবার বলে আসছেন, সার্বস্কা রিপাবলিকা বসনিয়া থেকে বিছিন্ন হবে।

এমনকি প্রয়োজনে সার্বিয়ার সাথে মিসে যাবে। তা হলে বসনিয়ার বিরুদ্ধে সার্বিক যুদ্ধ শুরু হবে। বসনিয়ার মুসলমানদের তেমন কোনো সামরিক প্রস্তুতি নেই। বসনিয়ার সার্ব পুলিশ রাশিয়া থেকে হাজার হাজার বন্দুক কিনেছে এবং রাশিয়ার পুতিনের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখেছে যেন পুলিশ ও সংসদীয় বাহিনী রাশিয়ার সেনাবাহিনী থেকে প্রশিক্ষণ নিতে পারে। যেকোনো সময় আবারো গণহত্যা শুরু হতে পারে। দোদিককে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সার্বরা অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। আরেক সেব্রেনিসা বা সারাজেভো হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার আবহ থাকলেও কোনো মহল প্রতিরোধের কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এটি কি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটা বড় ট্র্যাজেডি নয়? সার্বরা যাদের হত্যা করতে পারে তারা অসহায় মুসলমান। বিশ্ব সংস্থাগুলোও আগের মতোই নির্লিপ্ত, ইতিহাসের হয়তো করুণ পুনরাবৃত্তি হবে। ৪০ লাখ জনসংখ্যার দেশটি রাজনৈতিক ও আর্থিক সঙ্কটে জর্জরিত। এক-তৃতীয়াংশের বেশি লোক এখন বেকারত্বের সীমায় অবস্থান করছে। ২০১৪ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক লাখ বসনিয়ান তরুণ কাজের সন্ধানে দেশ ছেড়েছে। যারা বসনিয়ায় রয়ে গেছেন, তাদের নিয়ে সারাজেভো নতুন এক বধ্যভূমিতে পরিণত হবে এমন আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন সেখানকার মুসলিম অধিবাসীরা।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ সরকার ও গ্রন্থকার।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...

Close
Close