প্রথম বিতর্কে হিলারির কাছে ট্রাম্পের পরাজয়

trampমার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় গতকাল মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিক প্রতিদ্বন্দ্বির মধ্যে প্রথম বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বিতর্কে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের কাছে তার প্রতিদ্বন্দ্বি রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজিত হয়েছেন। ৯০ মিনিটের এই বিতর্কে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন লেস্টর হল্ট। বিতর্কে গলা শুকিয়ে যাওয়ায় তিনবার পানি পান করেন ট্রাম্প। পক্ষান্তরে একবারও পানি পান না করে বিতর্কে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন হিলারি। প্রায় ১০ কোটি মার্কিনী টেলিভিশনে এই বিতর্ক দেখেন। এক জরিপে বলা হয়, ৬২ শতাংশ দর্শক মনে করেন হিলারি জয়ী হয়েছেন এবং ২৭ শতাংশ মনে করেন ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন। উল্লেখ্য, সামনে এরকম আরো দু’টো বিতর্ক রয়েছে। সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, ফক্স নিউজ, হাফিংটন পোস্ট, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, গার্ডিয়ান, ওআরসি ও এবিসি নিউজ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দীর মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম বিতর্কে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের কাছে তার প্রতিদ্বন্দী রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ধরাশায়ী হয়েছেন। বিতর্ক শেষ হওয়ার পর সিএনএন/ওআরসির এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিনীই বিতর্কে হিলারিকে বিজয়ী মনে করছেন। যোগ্যতা নেতৃত্ব আর বোঝাপড়ার প্রশ্নে তারা এগিয়ে রাখছেন হিলারিকে।
গতকাল মঙ্গলবার তারা প্রথম পরস্পরের মুখোমুখি বিতর্কে অংশ নেন। একে মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের ইতিহাসে ‘সর্বকালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক’ বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে। ৯০ মিনিটের এই বিতর্কে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন এনবিসি টিভির লেস্টর হল্ট। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত প্রথম ওই বিতর্কে উঠে আসে বর্ণবাদ, যুদ্ধ, পররাষ্ট্রনীতি ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
বিতর্কের পর সিএনএন/ওআরসির প্রকাশ করা এক জরিপে বলা হয়, ৬২ শতাংশ মনে করেন হিলারি জয়ী হয়েছেন। আর মাত্র ২৭ শতাংশ মনে করেন ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন।
যারা সরাসরি বিতর্কটি দেখেছেন, টেলিফোনে তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এই জরিপ সম্পন্ন হয়। সরাসরি বিতর্ক উপভোগকারী রেজিস্টার্ড ভোটারদের মধ্যে ৫২১ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে জরিপটি পরিচালিত হয়েছে। সিএনএন/ওআরসির হিসেব অনুযায়ী, জরিপের ফলাফলে ৪৫ শতাংশ ত্রুটিবিচ্যুতি থাকতে পারে। এই জরিপে নির্বিচারি নমুনায়ন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে।
সিএনএন-এর খবরে বলা হয়েছে ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং তার প্রতিদ্বন্দ¦ী রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনির মধ্যে অনুষ্ঠিত বিতর্কের ফলাফলও এমনটাই হয়েছিল।
নির্বাচনি বিতর্কটি নিয়ে রেজিস্টার্ড ভোটাররা বলেছেন, ট্রাম্পের চেয়ে নিজস্ব মতামত অনেক যথাযথ ও স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন হিলারি। তারা মনে করেন, নির্বাচনী ইস্যুগুলোতে ট্রাম্পের চেয়ে হিলারির বোঝাপড়া অনেক স্বচ্ছ। প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যতার প্রশ্নেও এগিয়ে রয়েছেন হিলারি।
জরিপে দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ মার্কিনী হিলারিকে ট্রাম্পের চেয়ে বেশি উপযুক্ত প্রার্থী মনে করেন। বিপরীতে ট্রাম্পকে বেশি যোগ্য মনে করেন ৩৫ শতাংশ ভোটার। আর শক্তিশালী নেতৃত্ব দেয়ার প্রশ্নেও হিলারিকে এগিয়ে রাখছেন ভোটাররা। ৩৯ শতাংশ ভোটার যেখানে ট্রাম্পের শক্তিশালী নেত্বত্বে আস্থার কথা জানিয়েছেন, সেখানে হিলারির প্রতি আস্থা রেখেছেন ৫৬ শতাংশ ভোটার।
নিষ্ঠা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে অবশ্য দুই প্রার্থীর মধ্যে খুব বেশি ব্যবধান দেখছে না ভোটাররা। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ৫৩ শতাংশ মার্কিনী হিলারিকে বেশি নিষ্ঠাবান মনে করেন, যেখানে ট্রাম্পের নিষ্ঠায় আস্থার কথা জানান ৪০ শতাংশ ভোটার।
জরিপে ট্রাম্প অবশ্য একটি ক্ষেত্রে জয়ী হয়েছেন। প্রতিপক্ষকে আক্রমণেই বেশি সময় ব্যয় করার প্রশ্নে হিলারির চেয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি। কে বেশি আক্রমণকারী সেই প্রশ্নে ৩৩ শতাংশ মার্কিনী হিলারির কথা বলেছেন। যেখানে ট্রাম্পকে এগিয়ে রেখেছেন ৫৬ শতাংশ ভোটার।
উল্লেখ্য, নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণে দুই প্রার্থী ইতিমধ্যে প্রায় দেড় বছর কাটিয়েছেন। তাঁরা অসংখ্য বিতর্ক ও নির্বাচনী সভায় অংশ নিয়েছেন। পত্রিকা-টিভিতে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এসব ছাপিয়ে দুজনের জন্যই মুখোমুখি বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা প্রায় অর্ধেক মার্কিন ভোটার বিতর্ক দেখেই পছন্দের প্রার্থী বাছাই করে থাকেন। সামনে এমন আরও দু’টি বিতর্কে অংশ নিতে যাচ্ছেন হিলারি ও ট্রাম্প।
কার কথা সত্যি?: নিউইয়র্কের হেম্পসটিডের হফস্ট্রা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে দুই প্রার্থীর বাগ্যুদ্ধ। এ সময় তাঁরা পরস্পর অভিযোগের তির ছোড়েন। এসব অভিযোগের কতটা সত্যি, কতটাই-বা মিথ্যা, তা যাচাইয়ের চেষ্টা করেছেন সিএনএনের ‘সত্যতা যাচাই দল’।
ওই দলে রয়েছেন সিএনএন অনলাইনের প্রতিবেদক, গবেষক ও সম্পাদকেরা। এই দলের সদস্যরা বিভিন্ন ইস্যুতে দুই প্রার্থীর বর্তমান ও আগের অবস্থানের বিশ্লেষণ করেছেন। যাচাই করেছেন তাঁদের বক্তব্যের সত্যতা।
প্রথম বিতর্কে জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, আবাসন, ট্রাম্পের ব্যবসা, ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপএসব প্রসঙ্গ উঠে আসে। সিএনএনের যাচাই দলের পর্যালোচনায় এসব ইস্যুতে হিলারির বক্তব্যের সত্যতাই বেশি। ট্রাম্প বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উল্টোপাল্টা কথা বলেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তন: জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে দুজনের বক্তব্যের বিশ্লেষণ করেছেন সিএনএনের সংবাদকর্মী লরা কোরান। ক্লিনটন বলেছেন, ট্রাম্প মনে করেন, চীনারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। তবে ট্রাম্প তা অস্বীকার করেন। এখন প্রশ্ন হলো, দুজনের মধ্যে কে সত্যি, আর কে মিথ্যা বলছেন?
২০১২ সালের ৬ নভেম্বর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটারে দেয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, চীনাদের জন্য বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। ২০১২ সালের ৭ নভেম্বর ট্রাম্প আবার টুইট করেন, যুক্তরাষ্ট্রের চালাকির কারণেই জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্প আবার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরও চিন্তাভাবনা করা দরকার। দুঃখের বিষয়, চীন এ নিয়ে কোনো ভূমিকা রাখছে না।
মার্চ মাসে আবার কথা ঘোরান ট্রাম্প। ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা সম্পাদকীয়তে তিনি বলেন, তিনি মনে করেন না মানুষের কর্মকাণ্ডের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণেই এমন পরিবর্তন হচ্ছে। পরে ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, কৌতুক করে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তিনি চীনকে দায়ী করেছেন।
সিএনএনের যাচাই দল মনে করে, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ট্রাম্প বারবার তাঁর অবস্থান বদলেছেন। চীনকে দায়ী করার বিষয়ে হিলারির অভিযোগ সত্য।
কর্মসংস্থান: বিতর্কে হিলারি বলেন, তাঁর অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় এক কোটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ৩৫ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়ে যাবে।
এ ব্যাপারে কিছু বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে সিএনএন। মুডির বিশ্লেষক মার্ক জান্দি বলেন, অর্থনীতির গতিশীলতার কারণেই ৭০ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। হিলারি উদ্যোগ নিলে আরও ৩৫ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের আরেকটি বিশ্লেষণ বলছে, হিলারির অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হলে ২০২১ সালে দুই লাখ বাড়তি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ৪০ লাখ চাকরির সুযোগ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই হিলারির বক্তব্য সত্য। তবে এতে তথ্যগত কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে।
ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ: ট্রাম্পের অভিযোগ, বাণিজ্য চুক্তি ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) অনুমোদন করতে চেয়েছিলেন হিলারি। উত্তরে হিলারি বলেন, তিনি আশা করেছিলেন এটি ভালো চুক্তি হবে। কিন্তু চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় তিনি বুঝেছেন, এটি ততটা ভালো নয়। চুক্তির দায়ভারও তাঁর নয়।
সিএনএনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, ২০১২ সালে টিপিপি চুক্তির পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন হিলারি। কিন্তু ২০১৫ সালে এসে তিনি টিপিপির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। ওই সময় হিলারি এটাও বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি টিপিপি প্রত্যাখ্যান করবেন। অর্থাৎ, ট্রাম্পের অভিযোগের আংশিক সত্য। হিলারি টিপিপির পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এ কথা কখনো বলেননি যে তিনি সেটি অনুমোদন করবেন।
ট্রাম্পের ব্যবসা: ট্রাম্প সব সময় দাবি করেন, তিনি আত্মনির্ভরশীল। নিজের চেষ্টায় আজকের অবস্থানে এসেছেন। তাঁর এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন হিলারি। তিনি বলেন, আসলে ট্রাম্প খুবই ভাগ্যবান। তিনি ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। আর এই অর্থ তিনি ধার করেছিলেন তাঁর বাবার কাছ থেকে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাত দিয়ে সিএনএন বলছে, ১৯৮৫ সালে ট্রাম্পের ক্যাসিনো ব্যবসায় নেওয়া লাইসেন্স থেকে বোঝা যায়, সে সময় ট্রাম্প তাঁর বাবা ফ্রেড ট্রাম্পের কাছ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার ঋণ নিয়েছিলেন। সময়টা ছিল আশির দশকের শেষে। এটা ঠিক যে ব্যবসা শুরুর সময় ট্রাম্পের কাছে মাত্র ১০ লাখ ডলার ছিল। এর পাশাপাশি এটাও সত্যি যে ট্রাম্প তাঁর বাবার কাছ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার ঋণ নিয়েছিলেন।
বর্ণবাদ, কর্মসংস্থান ও যুদ্ধ ইস্যুতে দুই প্রার্থীর লড়াই : মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো দুই প্রার্থীর এই নির্বাচনী বিতর্কে বর্ণবাদ ইস্যুটিই সবথেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। পাশাপাশি এসেছে যুদ্ধ ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
হোয়াইট হাউজে পৌঁছানোর এই তীব্র প্রতিদ্বন্দি¦তা মার্কিন জনগণের মাঝে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করে। আগামী ৮ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ছয় সপ্তাহ আগে এই বিতর্ক বিপুল দর্শক টানে।
রাজনীতির মাঠে নবাগত ট্রাম্প প্রায়শই কৌশলকে কম গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। উল্টোদিকে রাজনীতিবিদ হিসেবে অভিজ্ঞ হিলারি ক্লিনটন এর আগে ২০০৮ সালের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থিতা প্রচারণায় বারাক ওবামার সঙ্গে বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। এছাড়া এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থিতা প্রত্যাশী বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গেও বিতর্কে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি।
বিতর্কে ৩ বার গলা শুকিয়েছে ট্রাম্পের!: হিলারি প্রমাণ দিলেন স্ট্যামিনার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন চলছে প্রতিদ্বন্দী প্রার্থীদের মধ্যে বিতর্ক।
বিতর্ককে সামনে রেখে দুই প্রার্থীরই প্রস্তুতি চলছিলো বেশ কয়েকদিন ধরে। সম্প্রতি নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়েও বিতর্কে একবারও পানি পান না করে নিজের শারীরিক সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন বলে মনে করছেন অনেকে। তবে, বিতর্ক চলাকালীন অন্তত তিনবার গলা শুকিয়েছে রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের। এ সময় তিনি তার সামনে রাখা গ্লাস থেকে পানি পান করেন।
বিতর্কে দেখা গেছে, হিলারি যখন ট্রাম্পকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তীর্যক মন্তব্য করছেন তখনই নিজের গলাটা সামনে রাখা সাদা পানি দিয়েই ভিজিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি।
এদিকে, বারবার শারীরিক সক্ষমতার প্রশ্নে জড়ানো হিলারি বিতর্ক চলাকালীন একবারও পানি পান না করে তার স্ট্যামিনার প্রমাণ দিয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হিলারি-ট্রাম্প বিতর্ক: পরস্পরকে আক্রমণ-উপহাস : যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মুখোমুখি বিতর্কে বাক্যবাণে পরস্পরকে ঘায়েল করার চেষ্টা চালিয়েছেন। একজন আরেকজনের দুর্বলতা লক্ষ্য করে তীক্ষ¥ কটাক্ষ করেন। একজন অনর্গল বলে যেতে থাকলে আরেকজন তাঁকে থামিয়ে বিব্রত করার চেষ্টা চালান। সিএনএন, বিবিসি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নয় বলে উভয় প্রার্থীই বিতর্কে একে অন্যের দিকে কাদা ছোড়েন। তাঁদের বিতর্কে কর্মসংস্থান, আয়কর, পররাষ্ট্রনীতি, সন্ত্রাসবাদ, বর্ণবাদ প্রভৃতি প্রসঙ্গ উঠে আসে।
হিলারি ও ট্রাম্প আরও দুটি বিতর্কে মিলিত হবেন। নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণে দুই প্রার্থী ইতিমধ্যে প্রায় দেড় বছর কাটিয়েছেন। তাঁরা অসংখ্য বিতর্ক ও নির্বাচনী সভায় অংশ নিয়েছেন। পত্রিকা-টিভিতে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এসব ছাপিয়ে দুজনের জন্যই মুখোমুখি বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য হিলারি ও ট্রাম্প গতকাল কার্যত ভোটারদের সামনে ‘সাক্ষাৎকার’ দিলেন। তাঁদের এই বিতর্কের ভিত্তিতে ভোটাররা ঠিক করবেন, কে বেশি যোগ্য।
দুই প্রার্থীর মধ্যে বিতর্কের ওপর নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক ভোটারের সিদ্ধান্ত। তিন পর্বের বিতর্ক দেখেই দেশটির ভোটারদের প্রায় ৫০ শতাংশ সিদ্ধান্ত নেবেন, কাকে ভোট দেয়া যায়।
ট্রাম্পের কথায় ১০ বার টেলিভিশন ভাঙতে উদ্যত হন নারীরা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনও নারী হিসেবে মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন হিলারি ক্লিনটন। তবে এক হাস্যরসাত্মক (স্যাটায়ার) ধাঁচের প্রতিবেদনে মার্কিন সংবাদমাধ্যম হাফিংটন পোস্ট বলছে, এই বিতর্কে খুশি হতে পারেননি নারীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টুইটার ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি তৈরি করে হাফিংটনপোস্ট।
ওই হাস্যরসাত্মক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিতর্কে অংশ নেওয়া ট্রাম্পের বক্তব্যে এমন কিছু মুহূর্ত ও বক্তব্য ওঠে আসে যাতে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন নারীরা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হিলারি ক্লিনটনের তিনটি প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের প্রথমটির ৯০ মিনিট হতাশ করেছে নারীদের।
হাফিংটন পোস্ট এরকম দশটি ঘটনার তুলে ধরেছে, যখন বিরক্ত হয়ে নারীরা টিভি ভাঙতে চেয়েছেন অথবা টিভির দিকে কিছু ছুড়ে মারতে চেয়েছেন ক্ষোভে। ৯০ মিনিটের এ বিতর্কে নারীদের জন্য হতাশার সেই ১০টি মুহূর্ত:
১। ট্রাম্প যখন কিছুক্ষণ থেমে ও কতৃত্ববাদী কণ্ঠে হিলারিকে বলেন, ‘আমি চাই আপনি সুখী হোন।’ কারণ ট্রাম্পের কাছে নারী মানে সব সময় তৃপ্ত ও হাসিখুশি। ফলে তাদের হয়ে কথা বলার অধিকার তিনি ভোগ করেন।
২। বিতর্কের পুরোটা সময় ট্রাম্প হিলারি কথা চালিয়ে যাওয়া অবস্থায় কথা বলেন। ক্লিনটন যখন গুরুগম্ভীর বিষয় ও রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন তখনও ট্রাম্প নাক গলিয়েছেন। হাফিনটন পোস্টের দািব, অনেক নারীকে এটাকে নারীর ওপর পুরুষের নাক গলানো হিসেবে বিবেচনা করছেন। অনেক নারী মনে করেন, এ ধরনের বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি প্রতিনিয়তই হতে হয় নারীকে।
৩। যখন ট্রাম্প পুরুষ হয়ে হিলারিকে একজন নারী বিবেচনা করে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করছিলেন বাস্তব অবস্থা বিবেচনা না করে।
৪। যখন ট্রাম্প কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার না করে নিউ ইয়র্কে অসাংবিধানিক হিসেবে স্বীকৃত বর্ণের ভিত্তিতে মানুষকে বিবেচনা করার নীতির প্রশংসা করেন।
৫। ট্রাম্প যখন অস্ত্রের অধিকার রক্ষার সংস্থা এনআরএ-এর রেটিং বৃদ্ধির প্রশংসা করেন। কারণ সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাড়িতে অস্ত্র থাকা মানে সেখানে নারীর খুনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
৬। যখন ট্রাম্প নিজের অর্থ, হোটেল ও সম্পদ নিয়ে বড়াই করা থেকে বিরত থাকতে পারছিলেন না। বারবার তা বলে যাচ্ছিলেন।
৭। উপয্ক্তু কথা খুঁজে না পেয়ে ট্রাম্প যখন হামাগুড়ি দিচ্ছিলেন।
৮। আমেরিকার রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে খিটখিটে মানুষ ট্রাম্প যখন দাবি করেন তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো মেজাজ রয়েছে।
৯। ট্রাম্প যখন বলেন, প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো মনোবল নেই হিলারির।
১০। হিলারির উদ্দেশে ট্রাম্প যখন বলেন, সব নারীকে প্রথমত ও সবার আগে কোমল মনের এবং দয়ালু হতে হবে।
হিলারি-ট্রাম্পের ‘বাগযুদ্ধ’ দেখলেন ১০ কোটি মার্কিনী : প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রতিদ্বন্দ¦ী ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান প্রার্থীর বিতর্ক উপভোগ করেছেন সে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগণ। প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্ক সরাসরি দেখেছেন দেশটির প্রায় ১০ কোটি নাগরিক।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওই বিতর্কে উঠে আসে বর্ণবাদ, যুদ্ধ, পররাষ্ট্রনীতি ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। একে মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের ইতিহাসে ‘সর্বকালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক’ বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে।
নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি দল তাদের পরিসংখ্যানে জানিয়েছে, প্রায় ১০ কোটি মার্কিন নাগরিক ওই বিতর্ক টেলিভিশন অথবা অন্য কোনও মাধ্যমে সরাসরি দেখেছেন। তারা এটিকে একটি ‘ঐতিহাসিক’ ঘটনা বলেও দাবি করছেন।
মার্কিন বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিলসেন জানিয়েছে, প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে গত ৫০ বছরের দর্শক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মার্কিন দর্শক ২০১২ সালের ৩ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দি মিট রমনির মধ্যকার বিতর্কটি দেখেছিলেন। ওই বিতর্ক দেখেছেন চার কোটি ৬২ লাখ মার্কিনী।
সঞ্চালকের বিরুদ্ধে হিলারির প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সংক্রান্ত বিতর্কে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের প্রতি সঞ্চালকের পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণা শিবির। ট্রাম্প শিবিরের একজন মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান খবরটি নিশ্চিত করেছে।
ট্রাম্পের প্রচারণা শিবিরের একজন মুখপাত্র বরিস ইফসেতিন সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, ‘লেস্টার হলে হিলারি কথা বলার সময় বেশিভাগ তাকে থামিয়ে নিজে কথা বলেছেন। ট্রাম্পের অবস্থানকেই বেশি করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। ট্রাম্পের ব্যাপারে তিনি বেশি কঠোর ছিলেন।’

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button