বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার এর পরিচালক মুফতী আব্দুর রহমান আর নেই

Mufti-A-Rahmanউপমহাদেশের বিশিষ্ট ফকিহ ও হাদিস বিশারদ, বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ফক্বিহুল মিল্লাত আল্লামা মুফতি আব্দুর রহমান আর নেই। তিনি আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭ ঘটিকায়  ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন৷ মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৯৬ বছর।
জানাগেছে, বুধবার সকাল ১০টায় বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার প্রাঙ্গণে তার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে৷ জানাযা শেষে বসুন্ধরা নতুন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। মুফতি আবদুর রহমানের মৃত্যুতে ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে।
মুফতী আব্দুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম। বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার-প্রসারে তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। হাজারো ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ও তত্ত্ববধানে পরিচালিত হয়। ১৯৯১ সালে রাজধানী ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তিনি ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার নামে উচ্চতর ধর্মীয় গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাঁর অগণিত ভক্ত ও শিষ্য রয়েছেন। বাংলাদেশে ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম রূপকার তিনি। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশেও তিনি ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
সংক্ষিপ্ত জিবনী: মুফতি আবদুর রহমান ১৯২৫ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ইমামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম চাঁন মিয়া।
তিনি নাজিরহাট ও হাটহাজারি মাদ্রাসায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক লেখাপড়া সমাপ্ত করেন। উচ্চমাধ্যামিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন। ১৯৫০ সালে সেখানে কওমি মাদরাসা পাঠ্যক্রমের সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেন।
দারুল উলুম দেওবন্দের ইফতা বিভাগের তিনি প্রথম ডিগ্রি লাভকারী মুফতি।
দেশে ফেরার পর পূর্ব এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র আল-জামিয়া আল ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হযরত মুফতি আজিজুল হক (রহ.) এর আহবানে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তাঁর কর্ম জীবনের শুভসূচনা করেন।
১৯৬২ সালে তিনি উত্তরবঙ্গ গমন করেন। সেখানে জনসাধারণকে নিয়ে বহু মসজিদ ও মাদরাসা, মক্তব ও হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করে নবপ্রজন্মের জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। সেখানকার সর্বজন পরিচিত ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র আল জামিয়া কাসেমুল উলুম জামীল মাদরাসা হযরত ফকিহুল মিল্লাত এর সর্বাত্মক চেষ্টারই ফসল।
মৃত্যুর আগে তিনি দেশের প্রায় ১৮টি উত্তরাঞ্চলীয় জেলার সহস্রাধিক দ্বীনি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত তানযীমুল মাদারিস আদ্বীনিয়্যা বাংলাদেশ (উত্তরবঙ্গ) এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
সুদীর্ঘ ছয় বছরের মিশন শেষে ১৯৬৮ সালে তিনি আল জামিয়া পটিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন। সেখানে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত পুরোদমে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি একাধারে জামিয়ার প্রধান মুফতি, সহকারী মহাপরিচালক ও শিক্ষা বিভাগীয় পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দাওরায়ে হাদিসে সর্বোচ্চ কিতাব বোখারি শরিফের ১ম খণ্ডের পাঠদান করেন।
আল জামিয়া পটিয়ার সহকারী পরিচালক থাকাকালে তিনি দেশব্যাপি একশ’ সদস্য বিশিষ্ট ইফতা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এ সময় তিনি ইসলামি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকিং-এর ক্ষেত্রেও অনন্য অবদান রাখেন। তিনি সুদভিত্তিক অর্থনীতির বিরুদ্ধে অতুলনীয় ভূমিকা রাখেন।
আরব বিশ্ব তথা দুবাই, বাহরাইন, কাতার ইত্যাদি রাষ্ট্র এবং ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে বড় বড় ইসলামি অর্থনৈতিক সেমিনারে তিনি যোগ দেন। এসব সেমিনারে ইসলামি অর্থনীতির উপর তাঁর গবেষণালব্ধ বিভিন্ন প্রবন্ধ খুবই সমাদৃত হয়।
ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরায় তিনিই সর্বপ্রথম ২০০২ সালে ইসলামি অর্থনীতি ও ইসলামি ব্যাংকিং বিভাগ চালু করেন। ইসলামি ব্যাংকিং ও অর্থনীতিকে এদেশের আলেম, ওলামা ও মাদরাসা পড়ুয়াদের মধ্যে বিস্তৃতির জন্য বেশ কয়েকবার আন্তর্জাতিক সেমিনারেরও আয়োজন করেন তিনি।
তাঁর উদ্যোগে ২০০২ সালে ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ঢাকাতে পক্ষকালব্যাপি এক আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
২০০৬ সালে ১৫ দিন ব্যাপি এক অর্থনৈতিক কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন করেন তিনি। এ কর্মশালা ও সেমিনার বাংলাদেশের আলেম ওলামাদের ইসলামি অর্থনীতি ও ব্যাংকিং এর ক্ষেত্রে বহুদুর এগিয়ে দেয়। এ বিষয়ে তাঁদের উৎসাহ ব্যাপকভাবেই বৃদ্ধি পায়।
হযরত ফকিহুল মিল্লাত আমৃ্ত্যু আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকের শরীয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০০৮ সালে তিনি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের শরীয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোনীত হন। দীর্ঘদিন তিনি সেন্ট্রাল শরীয়া বোর্ড ইসলামিক ব্যাংকস-এর ভাইস চেয়ারম্যানের পদ অলংকৃত করেন।
১৯৯০ সালে হযরত ফকিহুল মিল্লাত আধ্যাত্মিক জ্ঞানে পরিপূর্ণতার দিকে মনোনিবেশ করেন। খুব কম সময়ে তিনি আধ্যাত্মিক জগতের সকল স্তর অতিক্রম করে যুগ শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ পীরে কামেল শাহ আবরারুল হক সাহেব (রহ.) হতে খেলাফতপ্রাপ্ত হন।
১৯৯১ সালে তিনি রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থান বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ব্যতিক্রমধর্মী উচ্চ শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নাম দেন মারকাযুল ফিকরিল ইসলামী। এটি বর্তমানে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।
২০০৪ সালে তিনি বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় জামিআতুল আবরার নামে আর একটি প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন। বছরখানেকের ভেতর প্রতিষ্ঠানটি একটি বৃহৎ শিক্ষাকেন্দ্রে রূপ নেয়।
ফকিহুল মিল্লাত ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ নামে তাঁর একটি সেবামূলক সংস্থা রয়েছে। এ সংস্থার মাধ্যমে তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা, মক্তব, হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
তাঁর অবস্থান ছিলো জঙ্গিবাদ বিরোধী। তিনি সবসময়ই বলতেন, ইসলামে জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই।
জমিয়তের শোক: জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল্লামা শায়খ আব্দুল মোমিন, সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, মাওলানা মোস্তফা আজাদ, মহাসচিব মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমী এক বিবৃতিতে মুফতি আব্দুর রহমানের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button