অরিত্রির আত্মহত্যা এবং শিক্ষকের আচরণ

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী: শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেবার ব্যবস্থা রয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র। শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিষয়ক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে দেশে দেশে। এরপরও শিক্ষকরা সবাই শিক্ষক হবার উপযুক্ত হয়েছেন বলা যায় না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যথেষ্ট প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কোনও কোনও শিক্ষক পড়াতে সক্ষম হলেও শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রত্যাশিত আচরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ফলে অরিত্রিদের আত্মহত্যা করতে হয়। ওর বাবা দিলীপ অধিকারীদের অকালেই প্রিয় সন্তান হারাতে হয়। শিক্ষকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হয় জিম্মি শিক্ষার্থী ও তাদের অসহায় অভিভাবকদের।

উল্লেখ্য, আমাদের দেশে শিক্ষাবাণিজ্য এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অথচ শিক্ষা হচ্ছে একটি সেবা। আগের দিনে শিক্ষাকে ব্রত মনে করা হতো। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের চাইতেও ভালোবাসতেন। আদরস্নেহ করতেন। শিক্ষার্থীকে মানুষ করবার জন্য একজন শিক্ষক নিজের জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকতেন। শিক্ষার্থীরাও শিক্ষককে মেনে চলতো। এমনকি জন্মদাতা পিতার চেয়েও শিক্ষককে সম্মান করতো। মর্যাদা দিতো। কিন্তু সেদিন এখন আর নেই। বেশিরভাগ শিক্ষক যেমন তাইরেনাইরে করে শিক্ষকতা করছেন, তেমনই তাদের ছাত্র- ছাত্রীরাও যেনতেনভাবে শিক্ষিত হতে চাচ্ছে। আর এতেই সমস্যা বাড়ছে শিক্ষাক্ষেত্রে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের স্কুলশাখার ৯ম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার মর্মান্তিক ও অভিপ্রেত ঘটনা নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে তোলপাড় চলছে। শুধু ভিকারুননিসাতেই নয় এর উত্তাল ঢেউ দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষসহ কয়েক জন শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাতিল হয়েছে তাঁদের এমপিও। অরিত্রির বাবা দিলীপ অধিকারী মামলাও দায়ের করেছেন। সংশ্লিষ্টরা দোষী প্রমাণিত হলে নিশ্চয়ই তাদের আইনানুগ শাস্তি হবে। অরিত্রি লেখাপড়ায় ভালো। ভর্তিপরীক্ষায় সে ৩য় হয়েছিল বলে ওর বাবা দিলীপ অধিকারী জানান। মেয়েটি সব পরীক্ষাতেই মেধার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু মেয়েটি কেন আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হলো তা ভেবে দেখবার বিষয়। স্কুলে অরিত্রিদের বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। শিক্ষকদের অভিযোগ সে নকল করছিল। পরীক্ষার হলে নিষিদ্ধ সত্ত্বেও সে মোবাইলে প্রশ্নের উত্তর নোট করে এনেছিল। শিক্ষক তা ধরে ফেলেন এবং পরীক্ষার হল থেকে বের করে দেন। পরের পরীক্ষাও তাকে দিতে দেয়া হয়নি। স্কুল কর্তৃপক্ষ অরিত্রির মা-বাবাকে ডেকে আনলে মেয়ের অপরাধের জন্য তাঁরা ভুল স্বীকার করে অধ্যক্ষের কাছে মাফ চান এবং মেয়েকে পরীক্ষা দেবার সুযোগ প্রার্থনা করেন। অরিত্রিও অধ্যক্ষের পা ধরে কান্নাকাটি করে। এতেও অধ্যক্ষের পাষাণ হৃদয় গলেনি। উল্টো অরিত্রির সামনেই বাজে ভাষায় বাবাকেও গালমন্দ করে পরের দিন এসে টিসি নিয়ে যেতে বলা হয়। অরিত্রি তার অপরাধে বাবাকে সবার সামনে অপদস্থ করা সহ্য করতে পারেনি। তাই সে বাসায় গিয়ে ফেনের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। অরিত্রির এ অকাল মৃত্যু নিশ্চয়ই অপ্রত্যাশিত। বেদনাদায়ক। এমন মৃত্যুর জন্য মা-বাবা, শিক্ষক, অভিভাবক, বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী কেউই প্রস্তুত থাকে না। অরিত্রিরও ছিল না।

ভিকারুননিসায় ভালোরাই ভর্তি হয় বলে রেজাল্ট ভালো হয়। খারাপ কেউ এসে এখানে ভালো হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি খারাপ তা আমরা বলছি না। বলতে চাইও না। কিন্তু এখানে মাঝেমাঝে এমন ঘটনা ঘটছে যা সারা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। হতচকিত করে তোলে। মানুষের বিবেককে স্তম্ভিত ও আহত করে। অরিত্রির আত্মহননের ঘটনা তেমনই।

অনেকের জানবার কথা, মেধাবী ও ভালো ছাত্রছাত্রীরা এক-আধটু নকল করে। আমার অভিজ্ঞায় দেখেছি, ক্লাসের ফার্স্ট ও সেকেন্ড বয়েরাও কখনও সখনও নকল করে। একে অন্যকে টেক্কা মারতে এটা তাঁরা করে থাকে। তবে সেটা ব্যাপকভাবে নয়। বীজগণিতের দুই একটা সূত্র, জ্যামিতির চিত্র এগুলো নোট করে রাখে হাতের তালু বা জামার আস্তিনে। বলতে দ্বিধা নেই, এসএসসিতে আমিও জ্যামিতির দুটো চিত্র নকল করেছিলাম জ্যামিতিবক্সের নিচে নোট রেখে। চিত্র দুটো কমোনও পড়েছিল। এ না হলে আমার হয়তো পরীক্ষাপাস সমস্যা হতে পারতো। তাই বলে আমি ভালো কাজ করেছিলাম তা কিন্তু নয়। নিশ্চয়ই সেটা অপরাধই ছিল। মোবাইলে নোটবইয়ের ফটো কপি করে পরীক্ষার হলে এনে অরিত্রিও ভুল এবং অন্যায় করেছে। এজন্য বোর্ড অনুমোদিত শাস্তিরও ব্যবস্থা আছে। অরিত্রির শিক্ষকরা তা অবশ্যই করতে পারেন। তবে টিনেজার মেয়েটির জীবন নষ্ট হয় এমন কাজ করতে কোনও শিক্ষককে শিক্ষাবোর্ড বলেনি। বলতেও পারে না। অভিযোগ অনুযায়ী অরিত্রির মা-বাবাকে স্কুলে ডেকে এনে যেভাবে অপমান-অপদস্থ করেছেন স্কুলের অধ্যক্ষসহ অন্য শিক্ষকরা তা অবশ্যই বাড়াবাড়ি। মেয়ের সামনে শিক্ষকদের অপমানসূচক কথায় অপমানিত হয়ে বেচারা বাবা দিলীপ অধিকারী হাউমাউ করে কেঁদেছেন। আর এটাই মেয়েটির জন্য হয়েছে কাল। এমন অবমাননাকর ঘটনা সহ্য করবার ক্ষমতা অনেকেরই থাকে না। অরিত্রিরও ছিল না। শিক্ষার্থী অরিত্রির কোনও অপরাধ হয়নি তা কেউ বলবেন না। আমরাও বলছি না। তবে ব্যাপক নকল করে কেউ ভালো রেজাল্ট করতে পারে না। কোনওরকমে পাস করে যেতে পারে মাত্র। আর খারাপ শিক্ষার্থীকে বই দেখে লেখতে দিলেও ভালো উত্তর করতে পারে না। তার কারণ বই দেখে সঠিক উত্তর বের করে আবার তা লেখা যেনতেন শিক্ষার্থীর দ্বারা অসম্ভব। এ জন্যও ভালো পড়াশোনার দরকার হয়। বইয়ের ওপর দখল না থাকলে তা দেখেও লেখা যায় না। অরিত্রির আত্মহত্যার ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ভিকারুননিসায় গেছেন। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের শান্ত করতে চেষ্টা করেছেন। অরিত্রির মা-বাবাকেও সান্ত¡না দিয়েছেন। উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবারও কথা বলেছেন। ইতোমধ্যে ঘটনা তদন্তের ভার ডিবিতে ন্যস্ত হয়েছে। আশা করা যায়, তদন্তে অপরাধীরা চিহ্নিত হলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ দেশের নামকরা স্কুলকলেজের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। এখানে সবাই ছেলেমেয়েদের ভর্তি করাতে চান। সুযোগ পেলে ভর্তি করানও। কিন্তু এখানে ভর্তি হলেই সবাই ভালো হবে এর কোনও নিশ্চয়তা নেই। ভিকারুননিসায় ভালোরাই ভর্তি হয় বলে রেজাল্ট ভালো হয়। খারাপ কেউ এসে এখানে ভালো হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি খারাপ তা আমরা বলছি না। বলতে চাইও না। কিন্তু এখানে মাঝেমাঝে এমন ঘটনা ঘটছে যা সারা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। হতচকিত করে তোলে। মানুষের বিবেককে স্তম্ভিত ও আহত করে। অরিত্রির আত্মহননের ঘটনা তেমনই।

অরিত্রি ও তার মা-বাবার প্রতি ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের কতিপয় শিক্ষক যে আচরণ করেছেন তা কারুর কাম্য নয়। এতে বোঝা গেল ভালো প্রতিষ্ঠানের প্রধানশিক্ষক, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, শিক্ষক হলেই ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না। এই প্রতিষ্ঠানেরই অধ্যক্ষ ছিলেন হামিদা আলী। তাঁর এমন বদনাম আমরা শুনিনি। আজও ভালো শিক্ষাবিদ, শিক্ষক এবং অধ্যক্ষ হিসেবে হামিদা আলীর নামডাক রয়েছে। যতোটুকু মনে পড়ে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবার কারণে তাঁকেও এ প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যেতে হয়েছিল। তবে শিক্ষকসুলভ আচরণের জন্য ভিকারুননিসার এই সাবেক অধ্যক্ষের কেউ সমালোচনা করেছেন তা আমরা জানি না। এটা অবশ্য ঠিক যে, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষামানের বৃহত্তর স্বার্থে অনেক সময় কর্তৃপক্ষকে কঠোর পদক্ষেপ নিতেই হয়। এজন্য হয়তো হামিদা আলীও অনেকের বিরাগভাজন হয়েছেন। আর প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে এমন ছোটখাটো কারণ ঘটতেই পারে। তবে এসবকিছু উতরে যাওয়াই বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতার পরিচায়ক।

বলে রাখা ভালো, শিক্ষাপ্রদান হচ্ছে সেবা। একাজে যারা আসবেন তাঁদের সেবাপ্রদানের মানসিকতা থাকতেই হবে। শুধু অর্থ-বিত্তের জন্য শিক্ষকতার কাজে আসবার কাজটি সুবুদ্ধি ও বিবেচনাপ্রসূত নয়। এছাড়া যারা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নির্বাচন করবেন, তাঁদের ত্যাগের মানসিকতা থাকতে হবে। আচরণেও হতে হবে মার্জিত ও রুচিশীল। এমনকি ধৈর্য ও ক্ষমাশীল হওয়াও শিক্ষকের অন্যতম গুণ বা বৈশিষ্ট্য। আর যিনি নিজেকে আজীবন শিক্ষার্থী ভাবতে অভ্যস্ত তাঁরই উচিত শিক্ষাপেশায় আসা। তাই বলে পেট খালি রেখে কিংবা পরিবারপরিজনকে অভুক্ত রেখে শিক্ষকতা করতে হবে এমনও নয়। শিক্ষকরা শিক্ষাব্রতী হবেন। শিক্ষার্থীকে মানুষ করতে হবে এটাই হবে আদর্শ শিক্ষকের ধ্যান ও জ্ঞান।

ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্তূপ জমেছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানান, ভর্তির জন্য প্রত্যেক অভিভাবকের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেয়া হয়। এ বাণিজ্য রোধের জন্য লটারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। দাবি মেনে নেবার আশ্বাসে বিক্ষোভ স্থগিত করেছে শিক্ষার্থীরা। গতকাল থেকে পরীক্ষা নেবার কথা। ইতোমধ্যে অরিত্রিদের ক্লাসটিচার হাসনা হেনাকে উত্তরা থেকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে প্রেরণ করে।

দেশের সকল স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ বজায় থাকুক। শিক্ষকরা সসস্মমানে তাঁদের দায়িত্ব পালনে সক্ষম থাকুন। শিক্ষার্থীরাও দেশ এবং জাতিগতপ্রাণ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবার সুযোগ অর্জনে সক্ষম হোক, এমন আশাই আমরা করি। তার সঙ্গে ভিকারুননিসার পরিবেশ সুস্থ ও শিক্ষাবান্ধব হয়ে থাকুক এমন প্রত্যাশা আমাদের নিরন্তর।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button