পচে যাওয়া রাজনীতি ও একজন ডক্টর

এনাম চৌধুরী: ২০১৩ সালে আমেরিকা থেকে লন্ডন সফরে এসেছিলেন ডক্টর আব্দুল মোমেনI তখন জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধিI রমজান মাস ছিলI ব্রিটিশ-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্টির উদ্যোগে ডক্টর মোমেনের সম্মানে এক মতবিনিময় সভা ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেI পূর্ব লন্ডনের ওল্ড গেট ইস্ট এলাকার একটি রেস্টোরেন্টে অনুস্টিত এ মতবিনিময় ও ইফতার মাহফিলে সংবাদ কাভার করতে আমি নিজেও উপস্থিত ছিলামI চেম্বার প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে তখন মাহতাব চৌধুরীI নির্ধারিত সময়ের কিছু দেরিতে গিয়ে দেখলাম অনুষ্ঠানের আয়োজকদের অনেকেই তখনো উপস্থিত হন নাইI আমি নিজেও সেদিন প্রায় বিশ মিনিট দেরিতে গিয়ে দেখলাম মোমেন সাহেবের সাথে গল্প করছেন এনটিভি ইউরোপের সিইও সাবরিনা হোসেইনI সালাম দিলাম তাদেরI সালামের জবাব দিয়েই সাবরিনা আপা প্রথমে দেরি হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলেন “কিরে ভাই আমার দেরি হলো কেন? আমি জবাব দিয়েছিলাম -” আপা অন্য একটা কাজ শেষ হতে দেরি হওয়ার কারণে এখানেও আসতে দেরি হয়ে গেলোI” সাবরিনা আপা আমাকে তার পাশে একটি চেয়ার দেখিয়ে বসার জন্য বললেনI আমি বসার সাথে সাথে আমাকে দেখিয়ে ডক্টর মোমেন কে বললেন- মোমেন ভাই, “ও হচ্ছে আমাদের ঝাল মরিচ -সাংবাদিক এনামI সাবরিনা আপা আমাকে মজা করে এক এক সময় এক এক বিশেষণে কখনো “আমার প্রিয় ভাই, আবার কখনো “ঝাল মরিচ” বলে ডাকেনI আমি মোমেন সাহেবকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞাস করলাম ”কেমন আছেন স্যার? তিনি সালামের জবাব দিয়ে বিনয়ের সাথে বললেন -ভালো আছি ভাইI আমাকেও জিজ্ঞাস করলেন-আমি কোন পত্রিকায় কাজ করি? আরো ব্যক্তিগত অনেক কিছু?​

সেদিন মনে হয়েছিল মোমেন সাহেবের ভাই সকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত মন্ত্রীI তিনি নিজেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কিন্তু শিক্ষা তাকে বিনয়ী করেছে সত্যিকার অর্থেI যদিও ডক্টর মোমেনের ভাই মাল-মুহিত “রাবিশ- স্টুপিড” শব্দটাকে এতটাই বাজারজাত করেছেন যে, অনেককেই বাংলাদেশ সচিবালয়ের অর্থ মন্ত্রণালয়ে যেতে হলে অর্থ্যমন্ত্রণালয়ে যাবো না বলে “রাবিশ” মন্ত্রণালয়ে যাবো বলতে নাকি শুনা যায়I কিন্তু আমার ধারণা পুরোটাই ভুল প্রমাণিত হলো মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে!​

পেশাদার কূটনীতিক ডক্টর মোমেন জাতিসংঘের চাকুরী শেষ করে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশে বেশ কিছুদিন তার ভাই আবুল মাল মুহিতের সাথে কাজ রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় অংশ নেনI তখন থেকেই মিডিয়াতে খবর আসতে থাকে ডক্টর মোমেন সিলেট-১ আসনে তার ভাইয়ের স্থলাভিষিক্ত হবেনI হয়েছেনও তাইI এবারের নির্বাচনে মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসনের তিনি প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন আওয়ামীলীগের মনোনয়ন নিয়েI গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন পৃথিবীর যে সব দেশে রয়েছে সে গুলো​ ডক্টর মোমেনের দেখার সুযোগ হয়েছে বিধায় তার পক্ষে রাজনীতিতে সহনশীলতা, পরমত সহিষ্ণুতা, গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আলাদা হবে সেটাই আমার ধারণা ছিলI কিন্তু ডক্টর মোমেন ধারণাই পাল্টে দিলেনI সিলেট-১ আসনের নির্বাচনের পরিবেশ কেমন সেটা বিবেকবানদের কাছে বলার কিছু নাইI এখানে তার প্রতিদ্বন্ধী বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরI নিরীহ -ভদ্র রাজনীবিদ খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কঠিন এ সময়ে নির্বাচনী প্রচারণায় তার বক্তব্য গুলোতে যে সৌজন্যতার পরিচয় দিচ্ছেন সেটা সিলেটর রাজনীতিতে অনেক নেতার শেখার আছে অনেক কিছু। কাউকে কটাক্ষ না করে, বিদ্ধেষ না ছড়িয়ে যে রাজনৈতিক ময়দানে মানুষের কাছে পৌঁছে যায় সেটা বলতে গেলে নতুন রাজনীতিতে আসা একজন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির তার কার্যক্রমে প্রমান রেখে দিচ্ছেনI

২৩ বছর আগে (নিস্পত্তি হয়ে যাওয়া) কৃষি ব্যংকের একটি অর্থঋন জামিনদার ছিলেন বিধায় মরহুম আব্দুল মালিকের পুত্র খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রার্থীতা বাতিল করতে হবে! পিতা যদি কারো ঋণে জামিনদার হয়েই থাকেন তবে পুত্রকে সেই অপরাধে শাস্তি দিতে হবে এটা পৃথিবীর কোনো সুস্থ্য-স্বাভাবিক, বিবেক সম্পন্ন মানুষ চিন্তা করতে পারে?

গতকাল (২৬ ডিসেম্বর – বুধবার) ঘুম থেকে ওঠার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি সংবাদে দৃষ্টি আকৃষ্ট হলোI​
সংবাদটি ছিল -“খন্দকার মুক্তাদিরের বিরুদ্ধে মোমেনের করা রীট খারিজI”
পর খবরটি পরে সিলেটে সাবেক সাবেক সহকর্মীকে ফোন করে যা জানতে পারলাম সেটা এ রকম যেন- পিতার ফৌজদারী অপরাধে পুত্রকে ফাঁসি দানের আবেদন করা!​
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের পিতা মরহুম খন্দকার আব্দুল মালিক সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেনI প্রায় দেড় যোগ আগে তিনি পৃথিবী ত্যাগ করেছেনI ১৯৮৩ সালে কোনো এক সময় বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে তাঁর (খন্দকার আব্দুল মালিকের) পরিচিত জনৈক ব্যক্তি ঋণ গ্রহণ করেছিলেন এবং খন্দকার মালিক সেটার জামিনদার ছিলেনI ৩৩ বছর আগের ঘটনা এটিI সেই ঋণের বিষয়ে পরবর্তীতে নাকি অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের হয়েছিল এবং ২৩ বছর আগে সেই মামলাটি ফাইন্যাল নিস্পতিও হয়ে যায়I আইনের দৃষ্টিতে পিতা যদি অপরাধী হয়েও থাকেন তবে সেই অপরাধের সাজা তাঁর পুত্রকে প্রদানের দাবি করা কি স্বাভাবিক ভাবে দেখতে হবে নাকি যে বা যারা এই দাবি করেছেন তাদের অসৎ-অবিবেচক হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে?​ নাকি রাজনীতি যে কিছু মানুষকে ব্যাক্তিত্বহীন নির্বোধে পরিণত করে দেয় সেটার বাস্তব কোনো এক নমুনা আমরা দেখলাম ডক্টর মোমেনের কাছ থেকে! আমরা ভেবেছিলাম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করা মোমেন সাহেব এ ক্ষেত্রে ভদ্রতা দেখাবেন- দেখবেন বিশ্বস্বীকৃত সৌজন্যতা! কিন্তু তিনি কি করলেন?​

২০১৪ সালে তাঁর ভাই যে ভাবে ১৫৩ জন এমপিসহ বিনা ভোটে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে কলংকিত করেছিলেন সেই বাঁকা পথ খুঁজছিলেন! চাইলেন বিনা ভোটে সিলেট-১ আসনের এমপি হওয়ার স্বপ্নে তার প্রধান এবং শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে প্রার্থীতা বাতিলের জন্য রীট আবেদন করলেন!

২৩ বছর আগে (নিস্পত্তি হয়ে যাওয়া) কৃষি ব্যংকের একটি অর্থঋন জামিনদার ছিলেন বিধায় মরহুম আব্দুল মালিকের পুত্র খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রার্থীতা বাতিল করতে হবে! পিতা যদি কারো ঋণে জামিনদার হয়েই থাকেন তবে পুত্রকে সেই অপরাধে শাস্তি দিতে হবে এটা পৃথিবীর কোনো সুস্থ্য-স্বাভাবিক, বিবেক সম্পন্ন মানুষ চিন্তা করতে পারে? মোমেন কোন বিবেকে এই কাজটি করলেন? তার মাথায় কি একবারও আসলো না যে তিনি একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ? তাঁর কাছ থেকে দেশ-জাতি এমন অসৌজন্যতা, প্রত্যাশা করে না!!​
নাকি সংসদ সদস্য হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় বিনা ভোটে ২০১৪ সালের মতো তিনিও ১৫৩ কিংবা ১৫৫ জনের হিসেবী তালিকায় নাম লেখাতে চান? ডক্টর মোমেন আপনি অন্তত: বিনা ভোটের এমপি হওয়ার বদনামটি নিয়ে আমাদেরকে বিশ্বের দরবারে ছোট করবেন না।
আপনার এমন আচরণে আপনার সম্মান কি বেড়েছে নাকি ভোটের মাঠে আপনি নষ্ট, পচে যাওয়া তথাকথিত রাজনীতিবীদ হিসেবে নিজিকে তুলে ধরলেন?​
লন্ডন
২৭ ডিসেম্বর ২০১৮​
লেখক : সাংবাদিক কলামিস্ট ​
সম্পাদক- দা সানরাইজ টুডে

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...

Close
Close