গণভোটের ফলাফল বদলে দেবে ইউরোপের আকার

Scotland cartস্বাধীনতার প্রশ্নে স্কটল্যান্ডের গণভোটের ফলাফল যাই হোক, এতে ইউরোপের আকারে পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। কেননা প্রাচীন জাতি রাষ্ট্রগুলোর শক্তি ক্রমেই হ্রাস পাবে এবং ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে।
৩০৭ বছর একসাথে থাকার পর স্কটল্যান্ডের জনগণ যদি ইংল্যান্ড থেকে আলাদা হওয়ার জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়, তবে তাতে রাজনৈতিক ভূমিকম্প সৃষ্টি হবে এবং স্পেনের কাতালোনিয়া থেকে শুরু করে বেলজিয়ামের ডাচ ফ্যান্ডারদের মধ্যে পর্যন্ত স্বায়ত্তশাসনের রুচি প্রবল হবে।
অন্য দিকে তারা ‘না’ ভোট দিলে এডিনবার্গে আরো ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। আর তাতে ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে পরোক্ষ প্রভাব পড়বে। স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে গণভোটের নজির প্রতিধ্বনিত হবে গোটা মহাদেশে।  স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সমৃদ্ধ এলাকা এবং ইইউর ডজন খানেক সদস্য রাষ্ট্রের চেয়ে বড় ১১ লাখ লোকের বাসভূমি কাতালোনিয়ার জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠানের চাপ স্পেন সরকার উপেক্ষা নাও করতে পারে।
নিজেদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারের জন্য গত সপ্তাহে বার্সেলোনার রাস্তায় নেমে এসেছিল হাজার হাজার কাতালান।
এক প্রজন্ম ধরে স্নায়ুযুদ্ধ ইউরোপের মানচিত্রকে পরিবর্তনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তবে বার্লিন দেয়ালের পতনের পর থেকে রক্তপাতের মধ্য দিয়ে বলকান অঞ্চলে এবং অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবে বাল্টিক এলাকায় নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আর পুরনো রাষ্ট্রগুলোর রূপ বদলে গেছে।
ইউরোপের অনেক দেশেই কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা কমিয়ে বিভিন্ন অঞ্চল অনেক ক্ষমতা পেয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে স্পেনে জেনারেল ফ্রানসিস্কোর স্বৈরশাসন সমাপ্ত হওয়ার পর এ ধরনের ঘটনা ঘটে। বিশ্বায়ন ও ইউরোপীয় ইউনয়নের গঠনকে কেন্দ্রীয় শাসন ও স্থানীয় শাসনের দাবিদারদের মধ্যে টানাপড়েন শুরুর জন্য আংশিকভাবে দায়ী করা হয়।
ইউনিয়নের যেসব দেশ শত শত বছর ধরে একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল তারাই এখন এক মুদ্রা, পাসপোর্ট ছাড়াই ভ্রমণ, একক বাজার, পুঁজি, পণ্য ও একক সেবা লাভের সুযোগ পাচ্ছে। জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে তা মেনে নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ইইউ প্রশ্নে ব্রিটেন, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া ও নেদারল্যান্ডের গণভোটে এমনটিই দেখা গেছে। কেননা এসব দেশে ইউরোপীয় ইউনয়নের বিরুদ্ধে ভোট প্রদান করেছে জনগণের একটি বড় অংশ।
ইউরোপের দেশগুলো ‘উত্তরাধুনিক রাষ্ট্র’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন ব্রিটেন ও ইইউর সাবেক কূটনৈতিক রবার্ট কুপার।
২০০৩ সালে দি ব্রেকিং অব নেশন বইয়ে কুপার লিখেছেন, ইউরোপের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে একটি উন্নতর পদ্ধতিই হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ফলে জাতীয় সীমান্তের গুরুত্ব তাদের কাছে কমে গেছে এবং স্থানীয় বিষয়ে আরো বেশি গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে; কিন্তু সব সময় সমস্যা সমাধান করতে পারে না।
প্রকৃত কোনো ক্ষমতা ছাড়াই ১৯৯০ সাথে একটি ইউরোপীয় কমিটি গঠন হয়। স্থানীয় আঞ্চলিক বিষয়ে আলোচনার জন্য এটি গঠন হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রতিনিধি বলেন, আঞ্চলিক এ কমিটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। রাষ্ট্র ছাড়া আর কেউ কোনো ইস্যু ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে না।  জাতীয় সরকারের জোয়াল থেকে মুক্ত হয়ে ইউরোপের ঐক্যের একটি পথ সৃষ্টি করবে স্কটল্যান্ড ও কাতালোনিয়ার স্বাধিকার আন্দোলন। লন্ডন ও মাদ্রিদের মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে মুক্ত হয়ে এ দুই অঞ্চলের মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়নে তাদের নিজস্ব প্রতিনিধি চায়।
২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কট ইউরোপে কেন্দ্রীয়করণ ও আঞ্চলিকতার দু’টি শক্তি সৃষ্টি করে। ফলে ধনী ও গরিবের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বেলজিয়ামে ডাচভাষী ফ্যান্ডার ও ফ্রেঞ্চভাষী ওয়ালোনিয়া এবং ইতালি ও জার্মানিতেও আঞ্চলিক সঙ্ঘাত দেখা দেয়।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন...
Close
Back to top button